Ticker

6/recent/ticker-posts

স্ত্রীর ভরণপোষণ।

স্ত্রীর ভরণপোষণ।

 স্ত্রীর ভরণপোষণ।

পোস্টের সূচি।
------------------
১। স্ত্রীর ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ। 
২।স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য খরচ করার ফযিলত।
৩।স্ত্রী ভরণপোষণের হকদার হওয়ার শর্তসমুহ।
৪। ওয়াজিব ভরণপোষণের পরিমাণ।
৫। চাকরিজীবী কোনো স্ত্রী ভরণপোষণ পাবে কি?
৬। স্ত্রীর জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করা কি স্বামীর উপর ওয়াজিব?
৭। স্ত্রীর জন্য উচিত স্বামীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা।
৮।স্ত্রী সাবলম্ভী হলে নিজের স্বামী ও সন্তানদেরকে সদক্বা করা মুস্তাহাব।
৯। পুরুষরা হল মহিলাদের তত্ত্বাবধায়ক।

স্ত্রীর ভরণপোষণ।

স্ত্রীর মৌলিক অধিকারগুলো থেকে একটি  হলো: স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ আবশ্যক হওয়া। আর তা হলো অন্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ   স্ত্রীর জীবন ধারণ ও শরীর ঠিক রাখার জন্য যাবতীয় কিছুর ব্যবস্থা করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন, স্বামীরা হল স্ত্রীর উপর খরচকারী। আর স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর উপর মোহর ও ভরণপোষণ বাবদ খরচ করার কারণেই স্বামীকে স্ত্রীর অভিভাবকত্ব ও স্ত্রীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন: পুরুষ নারীদের অভিভাবক, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষগণ নিজেদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে। সূরা নিসা: ৩৪
তাছাড়া কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারাও স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। 
কুরআন থেকে প্রমাণঃ
একঃ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ 
প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচা দেবে আর যার জীবিকা সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে, (অর্থাৎ যে গরিব) সে, আল্লাহ তায়ালা তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে খরচা দেবে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তার বেশি ভার তার উপর অর্পণ করেন না। আল্লাহ সংকটের পর স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করে দেবেন। সূরা তালাক: ৭

দুইঃ সূরা বাকারার ২৩৩ নং আয়াতে বলেন:
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا} [البقرة: ২৩৩] 
সন্তান যে পিতার, তার কর্তব্য ন্যায়সম্মতভাবে মায়েদের খোরপোষের ভার বহন করা। (হাঁ) কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয় না। (সূরা বাকারা: ২৩৩)
উক্ত আয়াতের তাফসিরে ইবনে কাসির (রাহ:) বলেন অর্থাৎ শিশুর পিতার উপর অবশ্যক হল উত্তম রূপে শিশুর মাতার খোরপোশ ও কাপড় চুপড়ের ব্যবস্থা করা। আর بالمعروف  তথা উত্তম রূপে ব্যবস্থা করার অর্থ হলো: অপচয় ও কার্পণ্য ছাড়া স্বামীর সাধ্যমোতাবেক তার স্ত্রীর মতো অন্যান্য নারীদের যে ধরনের ভরণপোষণ প্রচলন আছে, সে ধরনের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। 

তিনঃ সূরা তালাকের ছয় নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: অর্থ: তারা গর্ভবতী হলে তাদের জন্য ব্যয় করতে থাক, যতক্ষণ না তারা সন্তান প্রসব করে। এই আয়াত যদি তালাক প্রাপ্তা গর্ভবতী স্ত্রীর ভরণপোষণ আবশ্যক হওয়ার প্রমাণ বহন করে, তাহলে তো বর্তমান স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা আরও আগেই আবশ্যক হবে। 

সুন্নাহ থেকে প্রমাণ:
হযরত জাবের (রাযি.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেনঃ 
অর্থ: তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। কেননা তারা তোমাদের বিবাহিত স্ত্রী। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামানতে গ্রহন করেছ এবং আল্লাহর কালামের মাধ্যমে তাদের গুপ্ত অঙ্গকে হালাল করে নিয়েছ। তাদের ওপর তোমাদের হক হল, তারা তোমাদের ঘরে এমন কাউকে আসতে দেবে না, যাদের তোমরা অপছন্দ কর। আর যদি তারা তা করে তাহলে তাদেরকে হালকাভাবে মারবে যাতে কঠিন আঘাত না লাগে। আর তোমাদের উপর তাদের হক হল, যথারীতি ও ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করবে। (সহিহ মুসলিম:২/৮৮৯)

হযরত জাবের (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছেন:
অতপর রাসূল (সা.) লোকটিকে বললেন. এই অর্থকড়ি তুমি প্রথমে তোমার নিজের জন্য ব্যয় করো। তারপর যদি কিছু অতিরিক্ত থাকে তাহলে তোমার পরিবারের লোকদের জন্য তা ব্যয় করো। অতপর তোমার নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় করো। এরপরও যদি কিছু অতিরিক্ত থাকে তাহলে তা এদিক সেদিক ব্যয় করো। এ বলে তিনি সামনে, ডানে ও বামে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন । (সহিহ মুসলিম:২/৬৯২) 

আল্লাহ যদি তোমাদের কাউকে কোনো অর্থকড়ি দেয় তাহলে তা প্রথমে নিজের উপর ও পরিবারের উপর খরচ করো। সহিহ মুসলিম: ৩/১৪৫৩
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:  যাদের ভরণ- পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করাই কোন ব্যক্তির জন্য গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সুনানে আবি দাউদ:২/১৩২
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, কোনো ব্যক্তি সকালে উঠে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে তা নিজের পিঠে বহন করে এনে অপরকে দান করে এবং এ দিয়ে অপরের দ্বারস্থ হওয়া থেকে মুক্ত থাকে। তার এ কাজ মানুষের দরজায় দরজায় চেয়ে বেড়ানোর চেয়ে উত্তম চাই তারা কিছু দিক বা না দিক। কেননা উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। যাদের ভরণ- পোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর ন্যস্ত তাদের দিয়েই দান শুরু করো। (সহিহ মুসলিম: ২/৭২১)
হাকিম ইবনে মু’আবিয়া আল-কুশাইরী (রাযি.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো উপর তার স্ত্রীর কি অধিকার রয়েছে? তিনি বললেন: যখন তুমি আহার করবে তখন তাকেও খাবার দেবে । আর যখন তুমি বস্ত্র পরিধান করবে অথবা যখন তুমি রুজি রোজগার করতে পারবে তখন তাকেও পোশাক পরিচ্ছদ দেবে। তার মুখমÐলে আঘাত করবে না , তাকে গালমন্দ করবে না এবং তাকে পৃথক রাখতে হলে ঘরের ভিতরেই রাখবে। (সুনানে আবি দাউদ: ২/২৪৪)
আর মুসনাদে আহমদে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: তাদেরকে পৃথক রাখলে ঘরের মধ্যেই রাখো । আর কিভাবেই তার সাথে এমন আচরণ করা যেতে পারে! অথচ দিন শেষে রাতেই তোমরা একে অপরের সাথে মিলিত হবে (অর্থাৎ সাহবাস করবে) তবে তাদেরকে যতটুকু শাস্তি দেওয়া হালাল ততটুকু দিতে পারবে। মুসনাদে আহমদ:৩৩/২৪৪
ইমাম বগবী (রহ.) বলেন, আবু সুলায়মান আল-খত্বাবী (রহ.) বলেছেন, উল্লেখিত হাদিসটি স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী  স্ত্রীর ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। 
হযরত আমর ইবনুল আহওয়াস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন. রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: শুনে রাখো! তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের কিছু হক রয়েছে এবং তোমাদের উপরও তোমাদের স্ত্রীদের কিছু হক রয়েছে। । তাদের ওপর তোমাদের হক হল, তারা তোমাদের ঘরে এমন কাউকে আসতে দেবে না, যাদের তোমরা অপছন্দ কর। আর তোমাদের উপর তাদের হক হল, যথারীতি ও ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের অন্নÑবস্ত্রের ব্যবস্থা করবে। (সুনানে তিরমিযী:৩/৪৫৯)
হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উত্বা রাসূল (সা.) এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক। সে আমার ও আমার সন্তানের প্রয়োজন পরিমাণ খরচ দেয় না। শুধু মাত্র এতটুকু যা আমি তার অজান্তে নিয়ে থাকি। তখন রাসূল (সা.) হিন্দাকে বললেন: তার সম্পদ থেকে নিয়মমাফিক নিজের ও বাচ্চাদের প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করো । (সহিহ বুখারী: ৭/৬৫)
 
ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন: উল্লেখিত হাদিসটি স্বামীর উপর স্ত্রীর প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে । এমনিভাবে প্রয়োজন পরিমাণ সন্তানের ভরণরপোষণের ব্যবস্থা করাও স্বামীর উপরই আবশ্যক স্ত্রীর উপর নয়। আর এ জন্যই স্বামী সে পরিমাণ ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রীর জন্য স্বামী থেকে স্বামীর অজান্তেই প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ নিয়ে নেয়া বৈধ। ইবনে কুদামা (রহ.) আরও বলেন: স্বামী স্ত্রী প্রাপ্তবয়স্ক হলে স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষন দেয়া ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের ঐক্যমত রয়েছে। তবে অবাধ্য স্ত্রীরা ভরণপোষণ পাবে না। 

যৌক্তিক দলিলঃ  
আর তা হলো এই যে, স্ত্রী একমাত্র বৈবাহিক সম্পর্কের কারণেই  নিজেকে স্বামীর ঘরে আবদ্ধ রাখে। স্বামীর অধিকার আদায়ের জন্যই সে তার কামায় রোজগার থেকে বিরত থাকে। সুতরাং সে নিজেকে স্বামীর ঘরে আবদ্ধ রাখাটা স্বামীর উপকারের জন্যেই। অতএব স্বামীর জন্য অবশ্যক হল তার স্ত্রীর উপর খরচ করা এবং তার প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। আর না হয় স্ত্রী তো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। অতএব এ সমস্ত কারণেই স্ত্রী ধনী হলেও স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব। কেননা তার ভরণপোষণ দেয়া শুধু স্ত্রীর প্রয়োজনের কারণেই নয়। বরং স্বামীর জন্য স্ত্রীর নিজেকে সোপর্দ করে দেয়ার কারণেও তাকে ভরণপোষণ দেয়া ওয়াজিব। 

স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য খরচ করার ফযিলত।  

মহৎ ব্যক্তি তো সে ই, যে তার পরিবারের জন্য উদারতার হাত সম্প্রসারণ করে রাখে এবং কৃপনতা ও অপচয় ব্যতীত সাধ্যানুযায়ী নিজ পরিবারের চাহিদা পূরণে স্বচেষ্ট হয়। যাতে করে তারা তাদের প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদের দিকে তাকিয়ে না থাকতে হয়। তাছাড়া নিজ স্ত্রী ও সন্তানদের উপর খরচ করার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে:  যেমন হযরত সা’দ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) তাকে বলেছেন:আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার প্রত্যাশায় তুমি তোমার পরিবারের জন্য যা কিছু খরচ করবে আখেরাতে তার প্রতিদান পাবে। এমনকি তুমি ভালোবেসে স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তোলে দিবে তারও প্রতিদান তথা সাওয়াব তোমাকে দেয়া হবে। সহিহ মুসলিম:৩/১২৫১
 অপর এক হাদিসে আবু মাসউদ আল আনসারী (রাযি.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন:
কোন মুসলমান যদি সাওয়াবের প্রত্যাশায় তার পরিবাবের জন্য খরচ করে তাহলে আখেরাতে সেটা তার জন্য সদক্বার সাওয়াব হিসাবে গণ্য হবে । সহিহ বুখারী: ৭/৬২
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
যে টাকা তুমি খরচ কর আল্লাহর রাস্তায় এবং যা তুমি খরচ কর গোলাম আযাদ করার জন্য এবং যে টাকা মিসকিনদেরকে সদক্বাা কর এবং যে টাকা তুমি খরচ কর তোমার পরিবারের জন্য সেগুলোর মধ্যে সবচে বেশি ও বড় প্রতিদান পাবে সেই টাকার জন্য যা তুমি তোমার পরিবারের জন্য খরচ করেছ। (মুসলিম শরিফ ২/৬৯২)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাযি.) কে রাসূল (সা.) বলেছেন: তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে রিক্তহস্ত পরমুখাপেক্ষী করে ছেড়ে যাওয়ার চাইতে বিত্তবান সম্পদশালী অবস্থায় রেখে যাওয়া অনেক উত্তম। কেননা তুমি তাদের জন্য যা কিছু আল্লাহর সন্তুষ্টের জন্য ব্যয় করবে এর প্রতিদান তোমাকেও দেওয়া হবে। এমনকি যে লোকমা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তোলে দেবে সে জন্যও তোমাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। 
সহিহ মুসলিম:৩/১২৫১
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রাহ) বলেন: উল্লেখিত হাদিসটি কল্যাণমুলক কাজে খরচ করা মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণ বহন করে। এবং সমস্ত কাজের সাওয়াব নিয়তের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। তাছাড়া এ হাদিসটি আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের প্রত্যাশায় পরিবারের উপর খরচ করার দ্বারা সাওয়াব লাভ হওয়ারও দলিল। আর এ হাদিস দ্বারা এটাও বুঝা যায় যে, জায়েয কোনো কাজে যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছা বা  নিয়ত করা হয় তখন তা আল্লাহ আনুগ্যত করার শামিল হয়ে যায় এবং তার বিনিময়ে অনেক প্রতিদান দেওয়া হয়। আর এ বিষয়টিই রাসূল (সা.) তার এ কথা দ্বারা ব্যক্ত করেছেন যে,
حتى اللقمة تجعلها في في امرأتك
অর্থাৎ যে লোকমা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তোলে দেবে তারও প্রতিদান দেওয়া হবে।

আর একজন স্ত্রী হলো স্বামীর ইহলৌকিক সুখের ঠিকানা এবং বৈধ চাহিদা পূরণের একমাত্র মাধ্যম ও তার আশ্রয়স্থল। অতএব একজন স্বামী তার স্ত্রীর মুখে লোকমা তোলে দেওয়াটা সাধারণত তোষামোদ, পারষ্পারিক ভালোবাসা আর আনন্দ পাওয়ার জন্য হয়ে থাকে। আর এগুলো ইবাদাত হওয়া বা আখেরাতের কোন বিষয় হওয়ার কথা নয়। তাসত্তে¡ও রাসূল (সা.) বলেছেন: আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় স্ত্রীর মুখে লোকমা তোলে দিলেও আখেরাতে স্বামীকে তার প্রতিদান দেয়া হবে। হযরত কা’ব ইবনে ওজরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন একদা রাসূল (সা.) এক লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন রাসূলের সাহাবীরা দেখলেন সে লোকটি খুব পরিশ্রম করে কাজ করছে। তাতে সাহাবীরা খুবই বিস্মিত হলেন এবং রাসূল (সা.) কে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তি যদি এমন পরিশ্রম আল্লাহর রাস্তায় করত তা হলে কতই না ভালো হতো! তখন রাসূল (সা.) তাদেরকে বললেন, যদি সে তার ছোট সন্তাদের জন্য উপার্জন করে। অথবা নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য উপার্জন করে এবং নিজেকে হারাম খাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য কষ্ট করে কামায়- রোজগার  করে, তাহলে তার এ সকল কাজ আল্লাহর রাস্তায় কাজ করার অন্তর্ভুক্ত হবে। (অর্থাৎ এ কাজেও সে সাওয়াব পাবে) আর যদি সে এ সব কাজ লোকদেখানো বা অহংকার বসত করে থাকে তাহলে তার এ সব কাজ শয়তানের রাস্তায় কাজের অন্তর্ভুক্ত হবে। 
হযরত মিকদাদ ইবনে মাদি কারুবা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন: যা তুমি নিজে খাবে এবং যা কিছু তুমি তোমার সন্তানদের খাওয়াবে এবং যা তুমি তোমার স্ত্রী ও কর্মচারীকে আহার করাবে তার সবগুলোর বিনিময়েই তুমি সদক্বার সাওয়াব পাবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন: পরিবারের জন্য হালাল উপার্জন করা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা থেকেও উত্তম ।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) একদা এক যুদ্ধে তার সঙ্গীদেরকে বলেছেন, তোমরা কি জানো! আমরা যে জিহাদে আছি তার চেয়ে উত্তম আমল কি? তারা বলল: না তো, আমরা তো সেটা জানিনা। আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বললেন, আমি জানি। তার সঙ্গীরা বলল, তাহলে বলেন সেটা কোন আমল? তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক (রহ.) বললেন: কোনো পরিবারবিশিষ্ট সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি, যে রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দেখে তার ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর সতর খুলা। তখন সে তাদের সতর ঢেকে দেয় এবং তাদের উপর কাপড় দিয়ে দেয়। তার এ আমল আমরা বর্তমানে যে জিহাদে আছি তার চেয়ে উত্তম । 

পুরুষের জন্য উচিত হলো তার স্ত্রী সন্তানদেরকে এমন হালাল খাবর খাওয়নো যাতে হারামের সন্দেহও নেই। কারণ পরিবারের জন্য হালাল উপার্জন করাও উলামায়ে কেরামদের মতে ফরজে আইন। হযরত কা’ব ইবনে ওজরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) আমাকে বলেছেন: হে কা’ব ইবনে ওজরা! শুনে রাখো! ঘুষের টাকায় যে রক্ত মাংস হয় তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। বরং তা শুধু জাহান্নামেরই উপযোগী। আর এ জন্যই পূর্বেকার নেকবান্দাদের স্ত্রীগণ তাদের স্বামীরা যখন কাজে বের হতো তখন তারা তাদের স্বামীদেরকে বলে দিতো: হে প্রিয় স্বামী, আল্লাহকে ভয় করুন! হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকুন! আমরা ক্ষুধা ও কষ্ট সহ্য করতে পারব কিন্তু জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে পারব না । 

স্ত্রী ভরণপোষণের হকদার হওয়ার শর্তসমুহ।

নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলেই স্ত্রী ভরণপোষণের হকদার হবে। 
এক: বৈবাহিক সম্পর্ক বিশুদ্ধ হতে হবে। 
দুই: স্ত্রী কর্তৃক নিজেকে স্বামীর কাছে সোপর্দ করতে হবে। 
তিন: স্বামীর জন্য স্ত্রী ভোগের সক্ষমতা থাকতে হবে। 
চার: স্বামী বৈধ কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে চাইলে স্ত্রী তাতে অসম্মতি প্রকাশ করতে পারবে না । 
পাঁচ: স্বামী সহবাস করার উপযুক্ত হতে হবে। এ শর্তগুলো না পাওয়া গেলে স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেয়া আবশ্যক নয় ।

ওয়াজিব ভরণপোষণের পরিমাণ।

 
এ ক্ষেত্রে মূল কথা হল আল্লাহ রব্বুল আলামিনের এই বাণী যাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: 
অর্থ: প্রত্যেক সামর্থবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচা দেবে আর যার জীবিকা সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে, (অর্থাৎ যে গরীব) সে, আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে খরচা দেবে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তার বেশি দায়িত্ব তার উপর অপর্ণ করেন না। আল্লাহ সংকটের পর স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করে দেবেন। সূরা তালাক: ৭
সচ্ছল ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এবং অসচ্ছল ব্যক্তিরা নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী উপঢৌকন দিয়ো। এটা সৎকর্মশীলদের প্রতি এক অত্যাবশ্যকীয় করণীয়। সূরা বাকারা: ২৩৬
সুতরাং এখানে দুইটি বিষয় লক্ষনীয়: এক: স্ত্রী সন্তানদের প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ দিতে হবে। আর এটা বিভিন্ন অবস্থা, জায়গা ও যুগের ভিন্নতায় বিভিন্ন ধরনের হবে। দুই: পুরুষের সামর্থ্য থাকতে হবে।
ভরণপোষণের ওয়াজিব পরিমাণ নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের অনেক অভিমত রয়েছে। তবে আমরা তাদের কথা থেকে যেটা বুঝতে পারি সেটা হলো তারা প্রত্যেকেই তাদের যুগ অনুযায়ী ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। অনুরূপভাবে ভরণপোষণের দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর অবস্থার বিবেচনা হবে নাকি স্ত্রীর অবস্থা বিবেচনা করা হবে এই নিয়েও তাদের অনেক মত রয়েছে। তবে উল্লেখিত কোরআনের আয়াতগুলো দ্বারা এটাই বুঝা যায় যে, ভরণপোষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর অবস্থাই বিবেচনা করা হবে । এটা ইমমা মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফী (রহ.) এর অভিমত ।

চাকরিজীবী কোনো স্ত্রী ভরণপোষণ পাবে কি?

স্ত্রী যখন বাড়ির বাহিরে বৈধ কোন কাজ বা চাকুরি করে আর স্বামী তাতে রাজি থাকে এবং সে তার স্ত্রীকে উক্ত কাজে বাধা না দেয় তাহলে উক্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ দেয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব। কেননা স্ত্রী নিজেকে স্বামীর ঘরে আবদ্ধ রাখাটা স্বামীর হক। এখন স্বামী ইচ্ছা করলে এ হক ছেড়েও দিতে পারে। কিন্তু স্বামী যদি তার স্ত্রীর উক্ত কাজে রাজি না থাকে এবং স্ত্রীকে উক্ত কাজের জন্য ঘর থেকে বের হতে বাধা দেয়া সত্বেও যদি বের হয় তাহলে উক্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। কারণ এ অবস্থাতে স্ত্রী কর্তৃক নিজেকে স্বামীর ঘরে আবদ্ধ রাখার স্বামীর যে হক রয়েছে তা নষ্ট হয়েছে।

স্ত্রীর জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করা কি স্বামীর উপর ওয়াজিব?

উলাময়ে কেরাম এ বিষয়ের উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, স্ত্রীর যখন বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে নিজেকে স্বামীর জন্য পরিপূর্ণভাবে সোপর্দ করে দেয় তখন স্বামীর উপর স্ত্রীর পোষাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থ করাও ওয়াজিব হয়ে যায়। কারণ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরাআনে বলেছেন:  অর্থাৎ: সন্তান যে পিতার, তার কর্তব্য ন্যায়সম্মতভাবে মায়েদের খোরপোষের ভার বহন করা।
তা ছাড়া হযরত জাবের (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত সেই হাদিস, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে রাসূল (সা.) পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: তোমাদের জন্য আবশ্যক হল তোমাদের স্ত্রীদের জন্য উত্তমরূপে অন্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা। কেননা জামাকাপড় স্ত্রীর জন্য সর্বদা প্রয়োজনীয় ও মৌলিক জিনিসের অন্তর্ভুক্ত।  সুতরাং তা ভরণপোষণের মতোই আবশ্যক। এমনিভাবে উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ের উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, স্ত্রীর প্রয়োজন পরিমাণ বস্ত্রের ব্যবস্থা করা স্বামীর উপর ওয়াজিব। আর এ প্রয়োজনের পরিমাণটা স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা যেমন স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা লম্বা হওয়া খাট হওয়া, চিকন হওয়া মোটা হওয়া এবং দেশের আবহাওয়া ঠাÐা হওয়া গরম হওয়া ইত্যাদির বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের হবে ।

স্ত্রীর জন্য উচিত স্বামীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা।

স্ত্রীর জন্য আবশ্যক হল আপন স্বামীর সামর্থের প্রতি রাখা এবং তার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করা। স্ত্রী সর্বদা মনে প্রাণে এ কথা বিশ্বাস রাখবে যে, রিযিক হল আল্লাহর পক্ষ থেকে বন্টিত জিনিস। আর আল্লাহর বন্টিত রিযিক নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাতেই দুনিয়ার জান্নাত এবং নেক বান্দাদের মনের প্রশান্তি। 
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: প্রত্যেক সামর্থবান ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচা দেবে আর যার জীবিকা সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে, (অর্থাৎ যে গরীব) সে, আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে খরচা দেবে। সূরা তালাক: ৭

অতএব স্ত্রীর জন্য স্বামীর সাধ্যের বাহিরে অধিক ভরণপোষণ দাবি করা কিংবা স্বামীর সাধ্য থাকলেও সমাজে প্রচলিত ভরণপোষণের চেয়ে বেশি দাবি করা স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তালায়া পবিত্র কুরআনে বলেছেন:   
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ [النساء: ১৯] আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। সূরা নিসা: ১৯
সূরা বাকারার ২২৮ নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন: আর স্ত্রীদেরেও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে। সূরা বাকারা:২২৮

তেমনিভাবে স্বামীর জন্যও স্ত্রীর ওয়াজিব পরিমাণ ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানানো জায়েয নেই। অনেক স্বামীরা অতি কৃপনতার কারণে স্ত্রী সন্তানদের ওয়াজিব পরিমাণ ভরণপোষণ আদায় করে না। এ অবস্থায় স্ত্রীর জন্য স্বামী অজান্তে নিজেদের প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ নিয়ে নেয়া বৈধ। কেননা একদা হযরত হিন্দা বিনতে উতবা (রাযি.) নিজের স্বামী আবু সুফিয়ানের কৃপনতার ব্যপারে রাসূল (সা.) কাছে অভিযোগ করল যে, সে তার স্ত্রী সন্তানদেরকে প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ দেয় না। তখন রাসূল (সা.) আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা (রাযি.) কে বললেন: তুমি সুফিয়ানের মাল থেকে তোমার ও তোমার সন্তানদের প্রয়োজন পরিমাণ ভরণপোষণ নিয়ে নাও । (যদিও সুফিয়ান না জানে) 

স্ত্রী সাবলম্ভী হলে নিজের স্বামী ও সন্তানদেরকে সদক্বা করা মুস্তাহাব।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) এর স্ত্রী যয়নাব (রাযি.) বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: হে মহিলাগণ তোমরা সদক্বা করো যদিও তোমাদের অলংকারও সদক্বা করতে হয়।

যায়নাব (রাযি.) বলেন রাসূল (সা.) এর এ বাণী শুনে আমি আমার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) কে গিয়ে বললাম, তুমি তো গরিব লোক। আর রাসূল (সা.) আমাদেরকে সদক্বার আদেশ দিয়েছেন। অতএব তুমি রাসূল (সা.) কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো তো, আমি যদি তোমাকে দান করি তাহলে সদক্বার সাওয়াব পাব কিনা? আর না হয়ত আমি অন্যদেরকে সদক্বা করব। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বললেন আমি যেতে পারবো না। বরং তুমিই গিয়ে বিষয়টি জেনে আসো।
যায়নাব বলেন তখন আমি নিজেই গেলাম। গিয়ে দেখি আমি যা জানার জন্য এসেছি আনসারী কিছু মহিলাও তা জানার জন্য রাসূলের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যায়নাব বলেন অতপর বেলাল (রাযি.) আমাদের কাছে বের হয়ে আসলেন। তখন আমরা তাকে বললাম আপনি রাসূল (সা.) এর কাছে গিয়ে বলুন, দু জন মহিলা আপনার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানতে এসেছে স্বামীকে এবং তাদের ঘরের এতিম শিশুদেরকে সদক্বা করলে তাতে সদক্বার সাওয়াব পাওয়া যাবে কিনা?  কিন্তু আপনি রাসূল (সা.) কে আমাদের কথা বলবেন না
 অতপর বেলাল (রাযি.) রাসূল (সা.) এর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে তাদের বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলেন। তখন রাসূল রাসূল (সা.) বললেন তারা কে? বেলাল (রাযি.) বললেন, এক জন হল আনসী মহিলা, আরেক জন হল যায়নাব (রাযি.)। রাসূল (সা.) বললেন, কোন যায়নাব? বেলাল উত্তর দিলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) এর স্ত্রী।
তখন রাসূল (সা.) বললেন: তারা ডাবল সাওয়াব পাবে। এক হল আত্মীয়তার, অপরটি হল সদক্বার। আর বুখারীর বর্ণানায় এসেছে যায়নাব নিজেই রাসূলকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকে আমাদেরকে সদক্বার আদেশ করেছেন। আর আমার কাছে আমার কিছু অলঙ্কার রয়েছে। তাই আমি ভাবলাম আমি তা সদক্বা করে দেব। কিন্তু আমার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলছে আমার জন্য তাকে এবং তার সন্তানদেকে সদক্বা করাই নাকি উত্তম হবে। তখন রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ। ইবনে মাসউদ ঠিকই বলেছে। তুমি যাদেরকে সদক্বা করবে তাদের তুলনায় তোমার স্বামী ও তোমার সন্তানরাই তোমার সদক্বা পাওয়ার বেশি হকদার। 

পুরুষরা হল মহিলাদের তত্ত্ববধায়ক। 

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
الرجال قوامون على النساء পুরুষ নারীদের অভিভাবক (সূরা নিসা ৩৪)
প্রতিটি সংসার টিকে থাকার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রয়োজন। যিনি পরিবারের বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা ও নেতৃত্ব দেবেন এবং পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আর পরিবারের জন্য আবশ্যক হল এ তত্ত¡বধায়কের কথা মান্য করা এবং পাপের কাজ ব্যতীত তার আদেশের আনুগত্য করা। আর আল্লাহ তায়ালা ঘরের এ পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছেন পুরুষদেরকে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: পুরুষ নারীদের অভিভাবক, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষগণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। সূরা নিসা: ৩৪
আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে দু টি কারণে মহিলাদের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছেন, প্রথমটি হল:
কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত দেওয়ার কারণে অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে মহিলাদের তুলনায় সৃষ্টিগতভাবে শক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি, ধৈর্য্য ও সহনশীলতা বেশি দেওয়ার কারণে এবং এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যা আল্লাহ তায়ালা শুধু পুরুষদেরকেই দিয়েছেন নারীদেরকে নয়। যেমন: তাদেরকে নবুওয়াতের  ও খেলাফতের  মতো বিশেষ গুণে গুণান্বিত করা, একজন পুরুষের সাক্ষ্যকে দুজন মহিলার সাক্ষ্যের সমমর্যাদা প্রদান করা, পুরুষকে মহিলার তুলনায় দ্বিগুণ মিরাস প্রদান করা এবং পুরুষকে একত্রে চারটি স্ত্রী রাখার বৈধতা প্রদান করার মতো বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মহিলার জন্য শুধু একজন স্বামীর কাছে থাকারই অনুমতি আছে। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা তালাক প্রদান, বিবাহ করা এবং তালাকে রেজ’ঈ দেওয়ার পর স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহন করার ক্ষমতা পুরুষকেই দিয়েছেন। অনুরূপভাবে সন্তানদেরকে বাবার দিকেই সম্বোধন করা হয় এবং জিহাদের মতো গুরুদায়েত্বও পুরুষদেরকেই দেওয়া হয়েছে। এমনকি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার অনেক মাসআলাও পুরুষদের সাথে সম্পৃক্ত মহিলাদের সাথে নয় । উল্লেখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপূন্ন অনেক বিষয় পুরুষদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে মহিলাদের পরিচালক বানিয়েছেন।
আর দ্বীতিয় কারণটিও আল্লাহ তায়ালা উপরোল্লেখি আয়াতেই উল্লেখ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
অর্থ: আর এ কারণেই যে, পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে স্ত্রীদের জন্য খরচ করে।

সুতরাং স্বামীর জন্য আবশ্যক হল বিবাহের শুরু থেকেই তার স্ত্রীর জন্য খরচ করা । অতএব স্বামীর জন্য ওয়াজিব হল স্ত্রীকে মোহর প্রদান করা এবং তার অন্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। এমনকি স্ত্রীকে তালাক দিলেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্ত্রীকে স্বামীর সম্পদ থেকে ভরণপোষণ দেওয়া এবং তার বসবাসের জায়গা দেওয়াও স্বামীর উপর ওয়াজিব।

Post a Comment

0 Comments