Ticker

6/recent/ticker-posts

রোজার জরুরি মাসায়েল।

রোজার জরুরি মাসায়েল।

 রোজার জরুরি মাসায়েল।

রোজা বলা হয় সুবহে সাদিক তথা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে আহার ও পান করা এবং স্ত্রীর সহবাস থেকে বিরত থাকা। 
রমজানের রোজার অনেক নিয়ম কানুন বা মাসয়ালা মাসায়েল রয়েছে। নিম্নে রোজার জরুরি কিছু মাসায়েল উল্লেখ করা করা হলো। 

ক রোজার নিয়তসংক্রান্ত মাসায়েল।

১। রোজার নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত না করলে রোজা হবে না। আর নিয়ত বলা হয় অন্তরের দৃঢ় সংকল্পকে। মুখে নিয়ত করা ফরজ নয়, শুধু অন্তরে নিয়ত করার দ্বারা রোজা হয়ে যাবে। তবে কেউ যদি অন্তরে নিয়ত করার সাথে সাথে মুখেও নিয়ত করে তা উত্তম। 
২। মুখে আরবিতে নিয়ত করা জরুরি নয়, বরং বাংলা ভাষায় নিয়ত করলেও হয়ে যাবে। তবে কেউ যদি আরবিতে শুদ্ধভাবে নিয়ত করতে পারে তাও ভালো।
৩। রমজানের রোজার নিয়ত রাত্র থেকে দ্বিপ্রহরের আগমুহূর্ত পর্যন্ত  করা  জায়েয আছে। তবে রাত্রে নিয়ত করাই উত্তম। 
৪। সুস্থ্য ও মুকীম ( অর্থাৎ যে শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসাফির নয়) ব্যক্তি রমজান মাসে অন্য রোজার নিয়ত করলেও রমজানের রোজাই আদায় হবে, অন্য রোজা আদায় হবে না। 

খ: সাহরী সংক্রান্ত মাসায়েল:

১। রোজা রাখার জন্য সাহরী খাওয়া সুন্নাত। ক্ষুধা না থাকলেও সাহরির সময় অল্প কিছু খেয়ে নেওয়া ভালো। 
২। কেউ যদি রাতে জাগ্রত না হতে পেরে সাহরী না খেতে পারে তাহলে সে সাহরী না খেয়েই রোজা রাখবে। সাহরী না খাওয়ার কারণে রোজা ছেড়ে দেওয়াটা বড় গোনাহের কাজ। 
৩। সাহরী দেরিতে খাওয়া সুন্নাত। অর্থাৎ সুবহে সাদেরেক কিছুক্ষণ আগে সাহরী খাওয়া শেষ করা।
৪। সাহরীতে খেজুর খাওয়া সুন্নাত। কিন্তু আমরা যেহেতু ভাত খাওয়ায় অভ্যস্ত, তাই সাহরীতে শুধু খেজুর খেয়ে রোজা রাখা আমাদের জন্য কষ্টকর হবে। এ জন্য সাহরীতে অন্য খাবারের সাথে দু’চারটা খেজুর খেয়ে নিলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। 
৫। যেহেতু সাহরি খাওয়া সুন্নত এজন্য কেউ যদি সাহরির সময় খানা না খায়, বরং দু’একটি খেজুর কিংবা একগ্লাস দুধ বা পানি অথবা চা খেলেও সাহরি খাওয়ার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। তার দ্বারাও সে সাহরি খাওয়ার সাওয়াব পাবে। 
৬। সুবহে সাদেক না হওয়া পর্যন্ত সাহরী খাওয়া জায়েয আছে। সুবহে সাদেকের পর আর সাহরী খাওয়া যাবে না। চাই আযান হোক বা না হোক। 

গ: ইফতার সংক্রান্ত মাসায়েল:

১। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। দেরী করে ইফতার করা মাকরূহ। 
২। মেঘলা দিনে একটু দেরিতে ইফতার করা ভালো। কারণ মেঘলা দিনে সূর্য অস্ত যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া একটু কষ্টকর। 
৩। ইফতার খুরমা বা খেজুর দ্বারা করা মুস্তাহাব। খুরমা বা খেজুর না থাকলে পানি দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব। 

ঘ: যে সকল কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।

১। ভুলে পানহার করার পর রোজা ভেঙ্গে গেছে মনে করে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানহার করে। (মারাকিউল ফালাহ)
২। কোনো অখাদ্য জাতীয় জিনিস গিলে ফেললে। যেমন: কংকর, লোহা, মাটি, পাথর, কাগজ, তুলা ইত্যাদি। (মারাকিউল ফালাহ)
৩। ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে। 
৪। সাহরীর সময় বাকি আছে মনে করে সুবহে সাদিকের পর সাহরী খেলে। 
৫। সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে সূর্য অস্ত গিয়েছে মনে করে ইফতার করলে। 
৬। শায়িত ব্যক্তির কণ্ঠনালীতে পানি ঢেলে দিলে। 
৭। কোনো মহিলার সাথে বেহুশ অথবা ঘুমন্ত অবস্থায় সহবাস করলে। তখন ঐ মহিলার উপর শুধু কাযা রোজা ওয়াজিব হবে। কাফফারা নয়। 
৮। কেউ যদি রমজানের রোজা রাখা বা না রাখার কোনো নিয়ত না করে থাকে এবং তার থেকে রোজা ভঙ্গের কোনো কারণও পাওয়া না যায় তাহলে তার উপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। 
৯। দাঁতের মধ্যে কোনো খাদ্যের টুকরা আটকে ছিলো তা যদি সুবহে সাদেকের পর জিহ্বার আগা দিয়ে ঐ স্থান থেকে বের করে মুখের ভেতরে রেখে খেয়ে ফেলে আর উহা যদি বুটের চেয়ে বড় হয় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি বুটের চেয়ে ছোট হয় তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু সেটা মুখ থেকে বের করার পর পূনরায় গিলে ফেললে রোজা ভেঙ্গে যাবে, খাদ্যটি যত ছোটই হোক না কেন।
১০। যদি কোনো মৃত মহিলা বা চতুষ্পদ জন্তুর সাথে সহবাস করে, অথবা যোনি বা পায়খানার রাস্তা ব্যতীত অন্য কোনো জায়গায় সহবাস করে, কিংবা স্ত্রীকে উত্তেজনার সাথে চুমু দেয় বা স্ত্রীকে খাহেশাতের সাথে স্পর্শ করে, এই সকল অবস্থায় যদি বীর্য বের হয় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি বীর্য বের না হয় তাহলে রোজা ভাঙ্গবে না। 
১১। মুখ ভরে বমি আসার পর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা পুনরায় গিলে ফেলে তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। 
১২। কুলি করার সময় অনিচ্ছকৃত বা অসতর্কতার কারণে কণ্ঠনালীতে পানি চলে গেলে রোজা ভেঙে যাবে। 
১৩। সুবহে সাদেক হওয়ার পর সুবহে সাদেক হয় নাই সন্দেহ করে সহবাস করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। 
১৪। ভুলবশত সহবাস করার পর রোজা ভেঙ্গে গেছে মনে করে পুনরায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করলে।
১৫। পানি বা ‍তৈল দ্বারা ভিজা আঙ্গুল পায়খানার রাস্তায় বা যোনিতে প্রবেশ করালে। 
১৬। পায়খানার রাস্তায় ঢুস দিলে। 
১৭। আগরবাতি ইত্যাদির ধোয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা গলার ভেতরে প্রবেশ করালে। 
১৮। দাঁত দিয়ে রক্ত বের হওয়ার পর যদি থুথুর সঙ্গে সেই রক্ত গিলে ফেলে তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু রক্ত যদি থুথুর চেয়ে কম হয় যাতে রক্তের স্বাদ পাওয়া না যায়, তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে না।

ঙ: যে সকল কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না। 

১। ভুলে যদি পানহার করে। 
২। ভুলে সহবাস করলে। 
৩। যদি (কামবস্তু) দেখা বা চিন্তা-ভাবনা করার দ্বারা বীর্যপাত হয়। 
৪। শরীরে তৈল ব্যবহার করলে। 
৫। সিঙ্গা লাগালে। 
৬। রোজা ভঙ্গ করার নিয়ত করে রোজা ভঙ্গ না করলে। 
৭। চোখে সুরমা লাগালে। 
৮। অনিচ্ছাকৃতভাবে কণ্ঠনালীতে ধোঁয়া, ধুলা-বালি অথবা মাছি ঢুকলে। 
৯। গোসল ফরজ হয়েছে এমতাবস্থায় সকাল করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। 
১০। অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে চাই মুখ ভরে হোক কিংবা অল্প বমি হোক।
১১। মিথ্যা কথা বললে,গীবত করলে,(অর্থাৎ অগোচরে কারো দোষ চর্চা করলে) অথবা কাউকে মন্দ কথা বললে রোজা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু রোজা রেখে এ সকল কাজ করলে রোজা মাকরূহ হবে। 
১২। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য যদি খাবার চিবিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে খাবার চিবিয়ে দিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে প্রয়োজান ব্যতীত এরকম করা মাকরূহ। 
১৩। কোনো জিনিস জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে শুধু একটু স্বাদ দেখে থুথু ফেলে দিলে রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে প্রয়োজন ছাড়া এরূপ করা মাকরূহ।
১৪। যে কোনো ধরণের ইঞ্জেকশন বা টিকা নেওয়ার দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে রোজার কষ্ট অনুভব না করার জন্য কেউ যদি শক্তিবর্ধক ইঞ্জেকশন অথবা স্যালাইন লাগায় তাহলে মাকরূহ হবে। 
১৫। রোজা অবস্থায় ইঞ্জেকশন দ্বারা শরীর থেকে রক্ত বের করলে রোজা ভঙ্গ হয় না। 
১৬। মেসওয়াক করলে এমননি মেসওয়াক যদি নিমের কাঁচের ডালের হয় এবং তা থেকে তিক্ততা জিহ্বায় অনুভব হয় তবুও রোজা ভঙ্গ হবে না।

চ: যে সকল কারণে রোজা না রাখার অনুমতি আছে। 

১। অসুস্থ ব্যক্তি রোজা রাখার দ্বারা যদি অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার ভয় হয় অথবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার আশংকা হয়, তখন তার জন্য রোজা ছেড়ে দেওয়া জায়েয আছে। সুস্থ হওয়ার পর তার জন্য উক্ত রোজার কাযা আদায় করতে হবে। তবে রোগ বেড়ে যাওয়া অথবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার কথা তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রবল ধারণা হতে হবে। অথবা কোনো মুসলিম, দ্বীনদার, ন্যায়পরায়ণ, অভিজ্ঞ ডাক্তারের বলতে হবে।
২। কেউ যদি শরিয়তসম্মত মুসাফির হয়, তাহলে তার রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তবে তার যদি কোনো ক্ষতি না হয় তাহলে রোজা রাখা উত্তম
৩। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী যদি রোজা রাখলে তার অথবা সন্তানের যদি মৃত্যু হওয়া বা অসুস্থ হওয়ার অথবা মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে তার জন্য রোজা না রাখা জায়েয আছে। তবে পরবর্তীতে রোজা কাযা রাখবে। 
৪। হায়েয(মাসিক ঋতুস্রাব) ও নেফাস (সন্তান প্রসব হওয়ার পর রক্ত নির্গত) অবস্থায় রোজা রাখা জায়েয নেই। হায়েয ও নেফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পর কাযা রাখতে হবে। 

 

Post a Comment

0 Comments