Ticker

6/recent/ticker-posts

সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা

সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা

 সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা।

         পোস্ট এর সূচিপত্র।
          ===============
  • সীরাতুন্নাবী ও মীলাদুন্নাবীর অর্থ।
  • নিজেকে বাহ্যিক সুন্দর্য্যমুণ্ডিত করা জন্য।  
  • আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জনের জন্য।
  • সুন্দর ও সুখময় পরিবার গঠনের জন্য। 
  • আদর্শ পিতা-মাতা হওয়ার জন্য।
  • আচার-আচরণকে শিষ্টতাপূর্ণ করার জন্য।
  • বিশুদ্ধভাষী হওয়ার জন্য। 
  • আদর্শ পেশাজীবী হওয়ার জন্য।
  • দায়িত্বসচেতন হওয়ার জন্য।
  • আল্লাহর প্রতি আস্থা ও মনোবল সৃষ্টির জন্য।
  • শোকে-দুঃখে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।
  • সুন্দর সভ্য সমাজ গঠনের জন্য। 
  • ঈমান মজবুত করার জন্য।
  • কোরআন বোঝার জন্য।

সিরাতুন্নাবী ও মিলাদুন্নাবীর অর্থ। 

সীরাত ও মীলাদ উভটি আরবি শব্দ। মীলাদ অর্থ শুভ জন্ম আর সীরাত অর্থ জীবনচরিত। অর্থাৎ মীলাদুন্নাবী মানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শুভ জন্ম, আর সীরাতুন্নাবী মানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনচরিত। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শুভ জন্মকে স্মরণ করে যে অনুষ্ঠাণ বা মাহফিল করা হয় তাকে মীলাদুন্নাবী মাহফিল বলা হয়। আর যে অনুষ্ঠান বা মহফিল হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনচরিত নিয়ে আলোচনা সম্পর্কে তাকে সীরাতুন্নাবী মাহফিল বলা হয়। একজন পূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য এবং নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পথে পরিচালনা করার জন্য সীরাতুন্নাবী জানার গুরুত্ব অপারিসীম।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :“তোমাদের জন্য অবশ্যই আল্লাহর রাসূলের এর মধ্যে উত্তম আদর্শ  রয়েছে” (সূরা আহযাব:২১) সুরতাং নিজেকে আদর্শ মানুষরূপে গড়তে হলে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনচরিত জানার বড় মাধ্যম হলো সীরাত পাঠ করা। 

সীরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা।

সীরাত তথা রাসূল (সা.)  এর জীবন আদর্শ। মহা মানব হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন আদর্শ অন্যান্য মনীষীদের জীবন আদর্শের মতো নয়। তার সরাতে রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য, রয়েছে হেদায়াতের ঝরনা ধারা এবং গোটা মানব জাতির ইহলৌকিক ও পরলৌকিক শান্তি ও মুক্তির দিশা। সুন্দর জীবন, সুশৃংখল সমাজ ও শান্তির রাষ্ট্র গঠনে মহা নবীর জীবন আদর্শের পদাঙ্ক অনুসরনের বিকল্প নেই। তিনি মুক্তির মশাল নিয়ে শান্তির দূত হিসেবে প্রেতির হয়েছেন এ ধরধামে।
 তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় পাঠকের মনে রেখাপাত করে। প্রীতি-ভালোবাস আর  শ্রদ্ধা-ভক্তির ঢেউ আছড়ে পড়ে সিরাত পাঠরেক মনের গহীন সমূদ্রে। আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ে হৃদয়। মানবতার প্রাণ আর রূহের সজীবতায় ভরপুর সিরাতের প্রতিটি অধ্যায়। মহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনকে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে নিখুঁত ও পরিপূর্ণ মডেল হিসেবে পেশ করেছেন বিশ্ববাসীর কাছে। সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে তিনি এই সুন্দর ভুবন থেকে বিদায় নিলেও বিদায় নেয়নি তার বর্ণিল জীবন আদশের আদর্শিক সত্তা। রবং তার এই জীবন আদর্শ মানবজাতির মুক্তির দিশারী হিসেবে চীর অমর হয়ে থাকবে এই পৃথিবীর বুকে।  নিম্নে সীরাত পাঠের মৌলিক কিছু প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। 

নিজেকে বাহ্যিক সুন্দর্য্যমুণ্ডিত করা জন্য।

একজন সভ্য ও সুন্দর মানুষ হওয়ার জন্য নিজের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিচর্যা করা ও পরিপাটি থাকা অত্যন্ত জরুরী। কারণ অভ্যন্তরীণ অনেক উচ্চমানের গুনাবলি থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি তার বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিচর্যা না করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকে, তাহলে সমাজ তাকে সভ্য মানুষ হিসেবে গণ্য করবে না। তাই নিজেকে সভ্য ও সুন্দর মানুষরূপে সমাজে উপস্থাপন করার জন্য বাহ্যিক অঙ্গের পরিচর্যা তথা চুল-দাড়ি সুন্দর করে রাখা, হাত-পায়ের নুখ কাটা, শরীরের বাড়তি পশম পরিষ্কার করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা, সাধ্যানুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা অপরিহার্য।

আমাদের সমাজে সৌন্দর্যের নামে সুস্থ রুচিবোধ ও আত্নমর্যাদাবোধের অভাবে নানা ধরনের পোশাক-আশাক, ভিন্ন জাতির অনুকরণে চুল-দাড়ি কাটার বিভিন্ন স্টাইল এবং হাত পায়ের নুখ বড় করে রাখাসহ অদ্ভুত অঙ্গসজ্জার বিভিন্ন ধরণ পরিলক্ষিত হয়। যার অধিকাংশই ভ্রদজনোচিত নয় সভ্য মানুষের আলমতও নয়। এ ক্ষেত্রে আপনি যদি নিজেকে একজন সুন্দর ও সভ্য মানুষ হিসেবে গড়তে চান, তবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্য-ভদ্র ও সুন্দর মানুষ তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত পাঠ করতে পারেন। সিরাতুন্নাবিতে আপনি পাবেন সুন্দর অঙ্গসজ্জা ও মার্জিত বেশভূষার চমৎকার সব শিক্ষা, যার অনুসরণ আপনাকে সভ্য-ভব্য ও সুদর্শন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করতেন । চুল দাড়ি আচড়িয়ে রাখতেন। মার্জিত ও শালিন পোশাক পরিধান করতেন। হাত-পায়ের নুখ কেটে ছোট করে রাখতেন এবং শরীরের বাড়তি পশম নিয়মিত পরিষ্কান করতেন। হযরত আয়েশা (রাযি.) এর কাছে যত সুগন্ধি থাকতো  সেগুলো থেকে সবচেয়ে উত্তম সুগন্ধিটি তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে মেখে দিতেন। এ ধরেনের সকল বিষয় সীরাত গ্রন্থ অধ্যায়ন করলে পেয়ে যাবেন। 

আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জনের জন্য।

মানুষের বহিরঙ্গের থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার মনোজগত। কারণ মানুষের মন বা আত্মা হলো সকল চিন্তা-চেতনার উৎসহ ও বহু গুণাবলির লালন ক্ষেত্র। মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু করে বা বলে সব কিছুর সূচনার কেন্দ্র হলো মন। আর মনের মধ্যে উদীয়মাণ বিষয়গুলোর প্রকাশ ঘটে বাহ্যিক অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে। তাই বলা যায় মানুষের প্রকৃত সারবত্তা হলো তার মনোজগত। সুতরাং প্রকৃত মানুষ ও পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য যেমনিভাবে বাহ্যিক পবিত্রতা জরুরী তেমনিভাবে আত্নার পরিশুদ্ধতা ও পবিত্রতা তার চেয়েও বেশি জরুরী ও অপরহার্য। কারণ আত্মার পরিচর্যা ও পবিত্রতা অর্জনের দ্বারা মানুষ সোনার মানুষে পরিণত হতে পারে। আবার তার প্রতি অবহেলার ফলে পাপ-পঙ্কিলতার দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে জঘণ্য থেকে জঘণ্য ও হিংস্রতম হায়েনায় পরিণত হতে পারে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশদা করেছেন: যে আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জন করেছে সে সফল হয়েছে। (সূরা আল আলা: আয়াত নং  ১৪) অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: অবশ্যই সে ব্যক্তি সফল হয়েছে যে তার আত্মকে পবিত্র করেছে। আর সে ব্যক্তি অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছে যে তার আত্মাকে পাপ পঙ্কিলতায় নিক্ষেপ করেছে। (সূরা আশ শামস: আয়াত নং৯)

অতএব প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার জন্য আধ্যাতিক পবিত্রতা অর্জনের বিকল্প নেই। আর আত্মার পবিত্রতা অর্জন ও অন্তর্লোকে নিহিত মহৎ গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে সর্বোত্তম পথের দিশা পাবেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিতে। কারণ সৃষ্টিকর্তা প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সে সকল মৌলিক উদ্দেশ্যে এই ধরাধামে প্রেরণ করেছেন তার উল্লেখযোগ্য একটি উদ্দেশ্য হলো তিনি তার ‍উম্মতদের আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা দান করবেন। তাই আত্মাকে পবিত্র করে নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তুলতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত তথা সীরাতুন্নাবী পাঠ করুন। তাঁর জীবন আদর্শে আপনি পাবেন সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা, কল্যাণকামিতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, বদান্যতা,  স্নেহ- ভালোবাসা, মায়া-মমতা, ন্যায়ের প্রতি অবিচলতা অন্যায়ের প্রতি বজ্রকণ্ঠ ও নিঃস্বার্থ ত্যাগ তিতিক্ষা সহ উৎকৃষ্ট গুণাবলি ও উত্তম চরিত্রের সকল উপাদান। যার দ্বারা আপনার আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জন হবে।

আদর্শ  পিতা-মাতা হওয়ার জন্য।

সন্তান মহান রবের পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত ও আমানত। এ নিয়ামতের যথাযোগ্য কদর করা ও আমানতে হেফাজত করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। সন্তানকে সুন্দরভাবে লালন-পালন করা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, আদব আখলাক শিক্ষা দেওয়া এবং আদর-ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলা পিতা মাতার কর্তব্য। সন্তানকে দ্বীন শিখিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য অভ্যস্ত করা তোলা এবং প্রাপ্তবয়স্ক হতে বিবাহ শাদির ব্যবস্থা করা এ সকর বিষয় আদর্শ পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ সকল বিষয়ে পূর্ণ দিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য সিরাত পাঠ করতে পারেন। সেখানে পেয়ে যাবেন রাসূল (সা.) তাঁর সন্তানদের জন্য কতটা আদর্শ পিতা ছিলেন কিভাবে সন্তানদের লালন-পালন করেছে এবং কত সুন্দর আদর্শবান ও খোদাভীরুরূপে গড়ে তুলেছেন। সন্তানদের জন্য আদর্শ মাতা-পিতা হওয়ার সকল উপাদান ও পরিপূর্ণ দিক নির্দেশনা রয়েছে প্রিয় নবী (সা.) এর সীরাতে। 

আচার-আচরণকে শিষ্টতাপূর্ণ করার জন্য।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া মানুষের বসবাস অসম্ভব। আর সমাজে শৃ্ঙ্খলা বজায় রেখে সভ্যভাবে চলার জন্য মানুষের আচার আচরণ শিষ্টতাপূর্ণ হওয়া অত্যন্ত জরুরী। কারণ সুন্দর ও মার্জিত আচরণ সমাজে সৌহার্দ্য ও সম্পীতি প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি চির শত্রুকেও বন্ধু বানিয়ে দেয়। অসভ্য ‍ও অশিষ্ট আচরণ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করে। অমার্জিত আচরণের ফলে পরস্পর অমিল, হানাহানি ও রক্তপাতের মতো ভয়ংকর পরিস্থির জন্ম দেয়। বর্তমানে আমাদের সমাজে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিই বিরাজ করছে। এর বড় একটি কারণ হলো আমাদের আচার-আচরণ মার্জিত ও শিষ্টতাপূর্ণ না হওয়া। তাই আমাদের উচিৎ আমাদের আচার আচরণকে মার্জিত ও পরিশীলিত করা।আর আমাদের আচার ব্যবহারকে সংশোধন করে শিষ্টতাপূর্ণ করার জন্য মডেল হিসেবে আমাদের সামনে আছে  প্রিয় নবী (সা.) এর জীবনচরিত। কারণ রাসূল (সা.) এমন এক মহা মানব যার চারিত্রিক মাধুর্যতার স্বীকৃতি দিয়েছেন মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন নিজেই। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। (সূরা ক্বলম:৪) রাসূল (সা.) এর সিরাত জুড়ে রয়েছে মার্জিত আচার ব্যবহারের সকল দিক নির্দেশনা। একজন মানুষের সাথে কেমন আচরণ করা দরকার, মজলিসে কিভাবে সবতে হবে, অতিথীকে কিভাবে সম্মান করতে হবে, কিভাবে তাকে বিদায় জানাতে হবে, আগন্তুককে কিভাবে সম্বোধন করতে হবে এবং বন্ধু-বান্ধব ও ছোট-বড় ভেদে আচরণের কেমন তারতম্য হওয়া প্রয়োজন ইত্যাদির সকল বিষয়ের সবক রয়েছে রাসূল (সা.) এর জীবনীতে। এ সকল বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য অবশ্যই আমাদেরকে রাসূল (সা.) এর সীরাত পাঠ করতে হবে। 

বিশুদ্ধভাষী হওয়ার জন্য।

বাকশক্তি মহান আল্লাহ তায়ার এক বিশেষ নিয়ামত। মানুষের জন্য বিশুদ্ধভাষী হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ একজন বিশুদ্ধভাষী সর্বত্রই আলাদা গুরুত্ব পেয়ে তাকে। ভাষা কেবল মানের ভাব প্রকাশেরই মাধ্যম নয়। বরং এর বহু কার্যকারিতাও রয়েছ। ভাষার কাছে তরবারিও হার মানে। এমনকি যাদুর চেয়েও বেশি প্রভাব সৃষ্টি করা যায় ভাষার মাধ্যমে। রাসূর (সা.) সিরাত পাঠ করলে অবশ্যই পাঠক বিশুদ্ধভাষী ও সদালাপী হতে উৎসাহ পাবে। কারণ রাসূল (সা.) সব সময় বিশুদ্ধ ও সাবলীল ভাষায় কথা বলতেন। তিনি যেন বিশুদ্ধ ভাষা শিখতে পারেন তাঁর শৈশবে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়ে ছিলো। রাসূর (সা.) এর ভাষা আরবি সাহিত্যের উজ্জ্বল ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। শুধু যে তিনিই বিশুদ্ধভাষায় কথা বলতেন এমনটি নয়।বরং তিনি তার সাহবীদেরেকেও সুন্দর সাবলীল ও বিশুদ্ধভাষায় কথা বলাতে উৎসাহিত করতেন। রাসূল (সা.) এর ভাষা ছিলো সুস্পষ্ট ও মাধুর্যপূর্ণ। তার ভাষায় কোনো রকম দুর্বোধ্যতা ও অশ্লীলতা ছিলো না। তার মধুর ভাষণে শ্রোতারা মুগ্ধ হতো। এমনকি তাঁর সাবলীল বচন শুনে চরম বিদ্বিষ্ট ব্যক্তিরাও চমৎকৃত হতো। তাঁর শাণিত ও তেজদীপ্ত ভাষণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে আচঁড়ে পড়তো। এ ধরণের সকল বিষয় সিরাতে উল্লেখ রয়েছে। তাই আামদের বিশুদ্ধভাষী হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য সীরাত পাঠের প্রয়োজন রয়েছে।

আদর্শ পেশাজীবী হওয়ার জন্য।

জীবন নির্ববাহের জন্য সকল মানুষেরই একটি অর্থনৈতিক জীবন থাকে। রাসূল (সা.) একটি অর্থনৈতিক জীবন ছিলো। আমার যেমন জীবন চালাতে অর্থোপার্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ, চাকারি ইত্যাতি পন্থা অবলম্বন করে থাকি, তেমনিভাবে রাসূল (সা.) ও ব্যবসা করেছেন, চাষাবাদ করেছে এবং অর্থের বিনিময়ে ছাগল চরিয়েছেন। বারো বছর বয়সেই  তিঁনি তার আপন চাচা তাবিলের সাথে সিরিয়ার পথে বাণিজ্যিক পথে অংশ গ্রহণ করেন। যৌবনে উপনীত হওয়ার পর খাদিজা (রাযি.) এর ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। রাসূল (সা.) ছিলেন সৎ ব্যবসায়ী এবং আদর্শ পেশাজীবী। আমাদের জন্য রাসূল (সা.) এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ। পেশা জীবনে আমরা সৎ ও আদর্শ কিনা সেটা যাচাই করতে আমাদেরকে সীরাত পাঠ করতে হবে। 

দায়িত্বসচেতন হওয়ার জন্য।

প্রতিটা মানুষের উপরই কোন না কোন দায়িত্ব থাকে। যেমন পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় , প্রাতিষ্ঠাকি ও নৈতিক দায়িত্বসহ বিভিন্ন প্রকার দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো আজ মানুষ দায়িত্ববোধ থেকে সরে গেছে। দায়িত্ব সচেতনতা খুব মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। বরং অধিকাংশ সময় দেখা যায় আমরা আমাদের নিজেদে দায়িত্ব আদায় না করে নিজেরদে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করি। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: সাবধান তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে (মৃত্যুর পর) জিজ্ঞাসিত হবে। আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে দুঃখ-দুর্দশা, নৈরাজ্য ও অরাজকতার বড় একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি অবহেলা। দায়িত্ব সচেতনতা না থাকার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রয় অশান্তির কালো ধোয়া ছেয়ে গেছে। অথচ সকলে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান থাকলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে শান্তির শীত হাওয়া বয়ে যেতো। সকল মানুষের মতো  আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) এরও পরিবার-পরিজন ছিলো। তাঁর স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে ছিলো। আত্মীস্বজন ও পড়া-প্রতিবেশী ছিলো। তাঁর একটি বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র ছিলো। তিনি তাঁর পবিরবার, আত্মস্বজন, পড়া-প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের সাথে কেমন আচরণ করে ছিলেন। এ সকল ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে কিভাবে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন এ সকল বিষয় তাঁর সিরাতের পাতা পাতায় ছড়ি আছে। সীরাতুন্নাবী পাঠের মাধ্যমে যে কোনো মানুষ নিজেকে দায়িত্ব সচেতন মানুষরূপে গড়তে পারবে। 

আল্লাহর প্রতি আস্থা ও মনোবল সৃষ্টির জন্য।

জীবন মানেই সংগ্রম।এই ভুবনে প্রতি মানুষেরই সংগ্রম করে বেঁচে থাকতে হয়। জীবন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখি হয়। জীবন চলার পথে মানুষকে একের পর এক সংগ্রম চালিয়ে যেতে হয়। সব সময় জীবনে প্রতিকূপ পরিবেশ থাকে না। বিভিন্ন বিপদ-আপদ, শারিক রোগ-ব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক সংকট, শত্রু পক্ষের আক্রমণ ও মানুসিক বিভিন্ন দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হতে হয় মানুষকে। মুমিনের জন্য প্রয়োজন এসব ক্ষেত্রে হতাশ না হয়ে নিজ অবস্থান ধরে রাখার জন্য আল্লাহর উপর আস্থা রাখা ও দৃঢ় মনোবল সৃষ্টি করা। বিভিন্ন অপ্রতিকূল পরিবেশে রাসূল (সা.) কখনো ভেঙ্গে পড়েননি। বরং এরকম পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে মনোবল বাড়িয়ে শক্ত থাকাই ছিলো প্রিয় নবীর জীবন আদর্শ। সীরাতুন্নাবী পাঠ করে দেখুন আবূ তালিব উপত্যকায় রাসূল (সা.) এর অবরুদ্ধ জীবন, তায়েফের হিজরতে নির্যাতন, হিজরতের কঠিন মুহূর্ত, বদরের যুদ্ধ, উহুদ যুদ্ধ, হামরাউল আসাদ ও হুনায়নের যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তগুলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণআস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে পারি দিয়েছেন। তিনি এমন কঠিন কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি ভেঙ্গে না পড়ে মনোবল শক্ত করে আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখে জীবন পারি দিয়েছেন। তাই বিপদ-আপদে মনোবল দৃঢ় রাখতে ও আল্লাহর উপর আস্থা রাখার উৎসাহিত হতে সীরাতুন্নাবী পাঠ করুন। রাসূল (সা.) এর জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা আপনার জীবন যুদ্ধের রসদ যোগাবে।

শোকে-দুঃখে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।

মানুষের জীবনে যেমন প্রাপ্তির সুখ আছে, তেমনি হারানোর ব্যথা বেদনাও আছে। জন্মের পর থেকে মানুষ বহু সুখের উপরকরণ লাভ করে থাকে। আবার সেগুলো সময়ের পরিক্রমায় হারাতেও থাকে। এটাই পৃথির নিয়ম। প্রকৃতি তার নিয়মে চললেই মানুষ কিন্তু তার প্রাপ্ত জিনিস হারতে চায় না। কারণ প্রাপ্ত জিনিসের সাথে দিনদিন মানুষের প্রীতি-ভালোবাসা ও মায়া-মমতার বন্ধন গড়ে উঠে। মানুষ এই বন্ধন কখনো হারাতে চায় না। বরং প্রকৃতির নিয়মে যখন এই বন্ধনের বিচ্ছেদ ঘটে বা প্রাপ্ত জিনিস হারিয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের হৃদয় ভেঙ্গে চূড়মার হয়ে যায়। বিচ্ছেদের ব্যথা -বেদনায় কাতর হয়ে শোকাহত হয়ে উঠে মানুষ। প্রতিটি মানুষ তার জীবন যাত্রায় কত কিছু যে হারায় তার কোনো ইয়ত্তাই না। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শক্তি-সামথ্য, ধন-সম্পদ, আত্মীয়স্বজন, আপন মানুষ যেমন: পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে ভাই-বোনসহ কতো কিছুই না হারাতে হয়। এই সব হারানোর ব্যথা বেদনায় মানব জীবন কখনো কখনো বিকল হয়ে পড়ে। কখনো ধৈর্যহারা হয়ে মারাত্মক কোনো দুর্ঘটাও ঘটিয়ে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে দরকার সান্ত্বনা, যাতে হৃদয়ে ব্যথা-বেদনার উপশম হয়। এসবের সান্ত্বনা পাওয়া যাবে সিরাতুন্নাবীতে। কারণ রাসূল (সা.) এর জীবনেও বহু দুঃখ বেদনা এসেছে। অনেক দুঃখ আর ব্যথা বেদানায় জর্জরিত হয়েছে রাসূল (সা.) এর জীবন। তাই রাসূল (সা.) এর জীবনী পাঠ করুন।

সুন্দর সভ্য সমাজ গঠনের জন্য।  

রাসূল (সা.) এমন সময় এই ধরায় আগমন করেন যখন আরবের সামাজিক অবস্থা অধঃপতনের চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। অশ্লীলতা, রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ-বিবাদ, অরাজকতার রাজত্ব ছিলো আরব সমাজে। রাসূল (সা.) সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি তার অনুপম আদর্শ দিয়ে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ভিত্তিতে একটি কল্যাণমূলক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একজন মহামানব ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। তিনি কিশোর বয়সেই সমাজ থেকে অন্যায়-অত্যাচারের মূলউৎপাটনের লক্ষ্যে হিলফুল ফুজুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এভাবে একটা অশৃঙ্খল সমাজ থেকে অন্যায়,পাপাচার প্রতিহত করে সমাজকে সুন্দর সভ্য সমাজে পরিণত করেছিলেন মুহাম্মদ (সা.), যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীর সামনে আদর্শ হয়ে থাকবে। তাই আমাদের সমাজকে আদর্শ সমাজে পরিণত করলে হলে সিরাত থেকে শিক্ষা দিতে হবে। এই জন্য সীরাত পাঠের বিকল্প নেই। 

ঈমান মজবুত করার জন্য।

মুমিনের জীবনে বহু বালা-মুসিবত দিয়ে আল্লাহ তায়ালা পরিক্ষা করে থাকেন। রাসূল (সা.) এর জীবনে অনেক বালা-মসিবত এসেছে এবং অনেক বাধাবিপত্তি ও ঝড়ঝাপটা পাড়ি দিয়ে হয়েছে তার। সিরাতের পাতা উল্টালেই এই সব ঘটনা পেয়ে যাবেন। এই ঘটনা অধ্যায়ন করলে ঈমান আরো মজবুত হয়। এমনকি কোনো অমুসলিমও যদি সীরাতুন্নাবী পাঠ করে তাহলেও ঈমান আনতে উদ্বুদ্ধ হবে। তা ছাড়া এমন অনেক ঘটনা আছে যে, ভিন্ন ধর্মের লোকেরা রাসূল (সা.) এর জীবনী পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই আমাদের ঈমান মজবুত করার জন্য সীরাত পাঠ করা প্রয়োজন। 

কোরআন বোঝার জন্য।

কোরআন হলো ইসলমী শরিয়তের মৌলিক উৎস। কোরআনে বিশুদ্ধ অর্থ, উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য ভালো বোঝার সিরাত অন্যতম সহায়ক গ্রন্থ। কারণ এই কোরআন নাযিল হয়েছে মুহাম্মদ (সা.) এর উপর। সুতরং কোরআনে বিধি-বিধান ও তাৎপর্য তিনিই সবচেয়ে বেশি বুঝেছেন এবং নিজের সেই অনুযায়ী পরিচালনা করেছেন। হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন রাসূল (সা.) এর চরিত্র ছিলো কোরআন। অর্থাৎ কোরআন যেভাবে নির্দেশ দিয়েছে রাসূল (সা.) পরিপূণ সেভাবেই পরিচালনা করে ছিলেন। বলতে গেলে কোরআনের তাফসীরই হলো সীরাতুন্নাবী বা রাসূল (সা.) এর জীবন আদর্শ। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রাসূল (সা.) সিরাত থেকে শিক্ষা নিয়ে সে অনুযায়ী পরিচালনা করার তাওফিক দান করুক। 
সুন্নাতের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে এটি পড়ুন। 

Post a Comment

0 Comments