Ticker

6/recent/ticker-posts

ইসলামী ব্যাংকিং(Islamic Banking) ব্যবস্থা

ইসলামী ব্যাংকিং(Islamic Banking) ব্যবস্থা

 ইসলামী ব্যাংকিং (Islamic Banking) ব্যবস্থা

পোস্ট এর সূচিপত্রঃ

১) ইসলামী ব্যাংক এর পরিচয়।
২) ইসলামী ব্যাংকিং বিকাশের ইতিহাস
৩) বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস
৪) ইসলামী ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য কি?
৫) ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য-উদেশ্য
৬) সুদি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের পার্থক্য।
৭) ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ পদ্ধতি

ইসলামী ব্যাংকিং (Islamic Banking) ব্যবস্থা

ইসলামের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বলতে ‍বুঝায় ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক আর্থিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে। ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুইটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। একঃ লাভ-লোকসানের ভাগ নেওয়া। দুইঃ সুদি লেনদেন হারাম হওয়া। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সর্ম্পুণরূপে ইসলামী হতে হলে তার সকল স্থরের কর্মকাণ্ড ইসলামী বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। কোনো ব্যাংক কেবল সুদি লেনদেন হতে মুক্ত থাকলেই তাকে সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যাংক বলা যাবে না। 

ইসলামী ব্যাংক এর পরিচয়।

অর্থনীতি মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ইসলাম অর্থনীতির চমৎকার নীতিমালা বর্ণনা করে দিয়েছে, যা দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার মূলমন্ত্র। আর ইসলামী ব্যাংকিং ইসলামী অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ। ইসলামী ব্যাংকিং এর পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা হলো।
উৎপত্তিগত অর্থ:  ব্যাংকিং যার আরবি হলো: مصرفي(মাছারিফ) আর ইসলামী ব্যাংকিং এর আরবি হলো  مصرفية أسلامية তবে ইসলামী ব্যাংকিং এই আরবি শব্দ থেকে উৎপত্তিলাভ করেনি। বরং ইংরেজি শব্দ :Bank Etymology অনুযায়ী প্রাচীন ইতালীয় শব্দ Banca অথবা মধ্যযুগীয় ফরাসী শব্দ Banque থেকে এসেছে।

ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা: 

ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) চমৎকারভাবে সহজ ও সাবলীল ভাষায় ইসলামী ব্যাংকিং এর সুনির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা প্রদান করেছে। যা ১৯৭৮ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে অনুমদিত ও সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। সংজ্ঞাটি হলো: Islami Bank is a financial institution whose statutes, rules and procedures expressly state its commitment to the principles of Islamic Shariah and to the banning of the receipt and payment of interest on any of its operations.
অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা তার মৌলিক বিধান ও কর্মপদ্ধতির সকল স্তরে ইসলামী শরীয়াতের নীতিমালা মেনে চলতে বদ্ধপরিকর এবং তার কর্মকাণ্ডের সকল পর্যায়ে সুদ বর্জন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। 

আর মালয়েশিয়ার ‘ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যাক্ট ১৯৮৩’ এর সূত্র অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে:
Islamic Bank is a company which carries on Islamic Banking business . . . . Islamic Banking business means banking business whose aims and operations do not involve any element which is not approved by the religion Islam.
অর্থাৎ “ইসলামী ব্যাংক একটি কোম্পানি যা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করে।  ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবসা মানে এমন ব্যাংকিং ব্যবসা যার লক্ষ্য এবং কার্যক্রমের সাথে এমন কোনো উপাদান জড়িত নয় যা ইসলাম ধর্ম দ্বারা অনুমোদিত নয়।

ইসলামী ব্যাংকিং বিকাশের ইতিহাস:

মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রর গোড়াপত্তনের পর ইসলামের অর্থনৈকিত বিধানসমূহ প্রবর্তন করা হয়। সুদকে সম্পূন্নরূপে নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলামের শুরু দিকে বর্তমান কালের মতো প্রতিষ্ঠানিক কোনো ব্যাংকের অস্থিত্ব ছিলো না। মুসলমানদের আর্থিক লেনদেনের জন্য ছিলো “বায়তুল মাল” বা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারী কোষাগার। তখনকার আর্থিক লেনদেনের জন্য “বায়তুল মাল” ই ছিলো যথেষ্ট। বায়তুল মালের লেনদেন ছিলো পরিপূর্ণ সুদ মুক্ত। উমাইয়া শাসনামলে ব্যাংকিং এর ব্যাপক উন্নতি হয়। 
অষ্টাদশ শতকে প্রাশ্চাত্য সভ্যতার মুক্ত অর্থব্যবস্থার নামে নোংরা অর্থনীতির কবলে পড়ে ইসলামী অর্থব্যবস্থা। ধীরে ধীরে সুদমুক্ত ইসলামী অর্থব্যবস্থার উপর প্রাশ্চাত্য অর্থব্যবস্থা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতকের পূর্বে সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা চালু ছিলো। কিন্তু এ শতকে ইয়াহুদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সুদি ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামের নীতিমালা অনুযায়ী রাসূল (সা.) কর্তৃক প্রবর্তিত এবং খোলাফায়ে রাশেদীন কর্তৃক অনুসৃত সুদবিহীন অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় ব্যাংক যখন একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে তখনও ব্যাংকে সুদ ছিলো নিষিদ্ধ। খ্রিষ্টানদের ‘ওল্ড টেস্টমেন্ট’ ধর্মগন্থেও সুদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ইয়হুদীরা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যাংকসমূহে সুদের প্রবর্তন করে। পরবর্তীতে খ্রিষ্টানরাও এক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে মুসলমানরাও সুদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়।
এভাবে ধীরে ধীরে মুসলমানদের জীবন যাত্রার সাথে মিশে যায় প্রাশ্চাত্যদের নোংরা অর্থব্যবস্থা। কিন্তু মুসলিম মনীষীগণ  সুদের বিরুদ্ধে সর্বদায় সোচ্চার ছিলেন । তাঁরা শুরু থেকেই মুসলিম জাতিকে সুদের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে গোটা ব্যাংক ব্যবস্থাকে ইসলামীকরণ ও সুদ মুক্তকরণের আহ্বান জানিয়ে আসছে। ভিবিন্ন দেশে ইসলামী চিন্তাবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও সাহিত্যিকগণ সুদি ব্যাংক ব্যবস্থাকে ইসলামী করণের লক্ষ্যে লেখালেখি, বক্তৃতা ও সভা সেমিনারের মাধ্যেমে তাদের বক্তব্য তোলে ধরেন। তবে সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর কলম ধরেন পাকিস্তানি ব্যাংকিং অর্থনীতিবিদ উজাইর, আর আরব বিশ্ব থেকে এ বিষয়ে লেখালেখি শুরু করেন শরী-আহ বিশেষজ্ঞ আল-সদর।

সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে তাদের লেখালেখি ও সভা সেমিনারের ফলে মুসলিম উম্মাহর সামনে এক নয়া দিগন্ত উম্মোচিত হয়। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম জনগণ ইসলামী ব্যাংকের প্রত্যাশায় ব্যাকুল হয়ে উঠে। যার ফলে ষাটের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংক, বীম, ইন্সুরেন্স কোম্পানী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। তবে আধুনিক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পূর্বে ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় মালোশিয়ায় এবং ১৯৫০ এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তানে ক্ষুদ্রাকারে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়ে ছিলো । কিন্তু সেগুলো বেশি দিন স্থায়ী ছিলো না।  

এরপর ১৯৬৩ সালে মালোশিয়ায় একজন মুসলিম যেন জীবনে একবার হলেও মক্কা-মাদিনায় গিয়ে হজ্জ পালন করতে পারে, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অর্থ সঞ্চয়ের জন্য ‘মুসলিম পিলগ্রিম সেভিংস কোর্পোরেশন’ নামে একটি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু হয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং এর যাত্রা শুরু হয় মিশরে ‘মিটগামার ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৩ সালে ডা. আহমদ আন নাজ্জার মিশরের বদ্বীপ শহর মিটগামারে ‘মিটগামার ব্যাংক’ নামে একট সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই ব্যাংক ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। ১৯৬৭ সালের মধ্যে মিশরের ৯টি প্রদেশে মোট ৯টি ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালে তৎকালীন মিশরের সমাজতান্ত্রিক সরকার রাজনৈতিক কারণে সকল ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মিশরের জনগেণের দাবীর প্রেক্ষিতে এবং রাজনৈতিক সমর্থন লাভের জন্য মিশরের সরকার ‘নাসের সোশ্যাল ব্যাংক’ নামে অপর একটি ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিলো সুদ মুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। তবে তখনো মিশর সরকার এই ব্যাংকের সনদে ইসলাম বা শর‘আহ আইন প্রসঙ্গে কিছু উল্লেখ করেনি। ১৯৭৩ সালে ফিলিপাইনে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিলিপাইন আমানাহ্ ব্যাংক(পিএবি) । এই ব্যাংকের সনদেও ইসলামী ব্যবস্থার কথা উল্লেখ ছিলো না।

১৯৭০ সালে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হয় ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রী সম্মেলন। এ সম্মেলনে প্রথম বারের মতো একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থ সংস্থা প্রতিষ্ঠার কথা আলোচনা হয়। ১৯৭৩ সালে ওআইসির পরবর্তী সম্মেলনে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(আইডিবি) চার্টার গ্রহীত হয়। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে ওআইসির ৫৭টি সদস্যরাষ্ট্র এবং অমুসলিম রাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতীর লক্ষ্যে সৌদি আরবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক তথা আইডিবি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সালের জুলাই মাসে আইডিবি ব্যাংকের প্রথম ‘বোর্ড অব গভর্নরস’ এর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০ শে অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু হয়। 

এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জোয়ার শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দুবাই ইসলামী ব্যাংক, ১৯৭৭ সালে ফয়সাল ইসলামিক ব্যাংক অব সুদান, ফয়সাল ইসলামিক ব্যাংক অব ইজিপ্ট, ১৯৮৩ সালে মালয়েশিয়ান মুসলিম পিলগ্রিমস সেভিংস, ১৯৯৭ সালে বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক। ১৯৯৭ সালে পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে তার ব্যাংকব্যবস্থাকে ইসলামীকরণের দিকে নিয়ে যায়। এভাবে শুধু ইসলামী দেশগুলোতেই নয় বরং ধীরেধীরে পশ্চিমা দেশগুলোতেও ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিম ইউরোপের লুক্সেমবার্গে একটি প্রতিষ্ঠান প্রথম ইসলামী ব্যাংকিং চালু করে। পরবর্তীতে যার নাম করণ করা হয় ‘ইসলামিক ফিন্যান্স হাউস’ নামে। এর কিছু দিন পর ডেনমার্কের কোপেনহেগেন- এ প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল। ২০০৪ সালে ইউরোপে জার্মানির স্যাক্সোনি আনহল্ট রাজ্যে প্রথম সুকুক তথা শরী‘আহসম্মত বন্ড ইস্যু করা হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। 

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিশ্বের মুসলিম মনীষীগণ যখন সুদমুক্ত  ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য লেখালেখি, সভা-সেমিনার ও বিভিন্ন কনফারেন্স শুরু করেন তখন বাংলাদের ইসলামী চিন্তাবিদগণও থেমে থাকেননি। বরং তরাও বাংলাদেশে সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তনের জন্য বিভিন্নভাবে দাবি জানাতে থাকেন। বাংলাদেশের মানুষ মুসলিম হিসেবে কোরআন সুন্নাহ ভিত্তিক  সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিলো  তাদের দীর্ঘদিনর লালিত স্বপ্ন। বাংলাদের মুসলিম জনগণের দাবি ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশ বিদেশের কয়েকজন বিজ্ঞ আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীও শিল্পপতিগণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। 
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য পদ লাভ করে। এ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) চার্টারে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে দেশের অর্থ ব্যবস্থাকে ইসলামী করণের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ১৯৮১ সালের জানুয়ারী মাসে সৌদি আরবের তায়েফে অনুষ্ঠিত ওআইসির তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ইসলামী দেশগুলোতে ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধান জন্য একটি স্বতন্ত্র ব্যাংকিং ব্যবস্থার চালু করার কথা উল্লেখ করেন। 

১৯৭৯ সালে নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ মহসিন দুবাই ইসলামী ব্যাংকের মতো  বাংলাদেশে একটি ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে পররাষ্ট্র সচিবের কাছে  একটি চিঠি লেখেন। এর পরপরই ডিসেম্বর মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং উইং বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমত জানতে চায়।  ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন গবেষণা পরিচালক এ এস এম ফখরুল আহসান  ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য দুবাই ইসলামি ব্যাংক, মিসরের ফয়সাল ইসলামি ব্যাংক, নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক সমিতির কায়রো অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন।

এরপরই ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে আইডিবি’র একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেন এবংএখানে বেসরকারীভাবে যৌথ উদ্যোগে একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। অতপর  ১৯৮৩ সালের ৩০শে মার্চ ব্যাংক ব্যবস্থায় পরিপূর্ণরূপে ইসলামী শরী‘আহ নীতি অনুসরণের অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’। এ বংকের মূলধন যোগানে অংশগ্রহণ করে: ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(আইডিবি), দুবাই ইসলামি ব্যাংক, বাহরাইন ইসলামি ব্যাংক এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এরপর ১৯৮৩ সারের ১২ই আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাংক তার ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮৬ সালে ‘আল বারাকা ব্যাংক লিমিটেড’ নামে  বাংলাদেশে দ্বিতীয় ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। 

পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে ইসলামী শরী‘আহ মোতাবেক  পরিচালিত আরো চারটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেগুলো হলো: (১) আল্ আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড, (২) সোস্যাল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (৩) প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড (ইসলামি শাখা) (৪) শাহজালাল ব্যাংক। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১০টি ইসলামী ব্যাংক রয়েছে। পূর্বে তার সংখ্যা ছিলো ৮টি। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের আওতায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এই দুইটি যুক্ত হয়েছে। নিম্মে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ করা হলো:
১। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
২। আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। 
৩। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। 
৪। আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। 
৫। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। 
৬। এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড। 
৭। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। 
৮। ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড। 
৯। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড। 
১০। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক লিমিটেড। 

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের (Islamic Banking) বৈশিষ্ট্য।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূন্ন ইসলামী শর‘আহ নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা। তাই তার সকল কার্যাবলী ও লেন-দেন কোরআন সুন্নাহর নিয়ম-নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সাধরণ ব্যাংক ব্যবস্থার তুলানায় ইসলামী ব্যাংকিং এর রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। নিম্মে ইসলামী ব্যাংক এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
এক: ব্যাক্তিগত স্বার্থ নয় সর্বজনীন কল্যাণ ব্যাংক। মূলত ইসলামী ব্যাংক একটি সর্বজনীন ব্যাংক ব্যবস্থা। ইসলামী ব্যাংক কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট কোনো জাতি-গোষ্ঠি কিংবা কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণীর ব্যাংক নয়। বরং এই ব্যাংক সমস্ত মানব জাতির জন্য এবং ধনী-দরিদ্র সকলের জন্য। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় সামাজিক কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়, কোনো ব্যাক্তিগত স্বার্থের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না।  
 
দুই: ইসলামী শরী‘য়াহ মোতাবেক পরিচালিত: ইসলামী ব্যাংক তার সকল কার্যক্রম ইসলামী শরী‘আহ নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করে। এ ব্যাংকের আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ প্রদান ইসলামী শরী‘আহ মোতাবেক করে থাকে। তাছাড়া এ ব্যাংকের সভা-সেমিনার, পরামর্শ পেশ, কর্মকর্তা -কর্মচারী ও প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি নিষেধের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হয়। 

তিন: সুদবিহীন ব্যাংকিং: ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অর্থ ব্যবস্থাকে অভিশপ্ত সুদ মুক্ত করা এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রবর্তন করা। ইসলামী ব্যাংক তার সকল প্রকার লেদ-দেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তহবিল সংগ্রহ ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সুদকে এড়িয়ে চলে। 

চার: টাকার কারবার নয়, পণ্যের ব্যবসায় নিয়োজিত: ইসলামী ব্যাংক কখনো টাকার কারবার করে না, বরং পণ্যের ব্যবসা করে। এ ব্যাংক ক্রয় বিক্রয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন: মুরাবাহা, বায়-ই-মুয়াজ্জল, বায়-ই-সালাম, ইজারা, ভাড়ায় ক্রয় ইত্যাদি এর মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কাউকে টাকা প্রদান করে না; বরং পণ্য সরবাহ করে।

পাঁচ: দাতা-গ্রহীতা নয়, অংশীদারিত্বের সম্পর্কঃ সুদভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকের গ্রাহকদের, ব্যাংকারদের দাতা গ্রহীতার সম্পর্ক থাকে। আর ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থায় সঞ্চয়কারীদের লাভ-লোকসান ব্যাংকের লাভ-লোকসানের সাথে সর্ম্পক থাকে। কারণ ইসলামী ব্যাংক তাদের ঋণ গ্রহীতাকে পণ্য বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়। ফলে ব্যাংকের অংশিদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগের লাভ-লোকসান বিনিয়োগ গ্রহীতা বা ঋণ গ্রহীতাদের ব্যবসায়িক লাভ-লোকসানের উপর নির্ভরশীল থাকে এবং সকল প্রকার লাভ-লোকসান ব্যাংক ও গ্রাহকদের উপর বর্তায়। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক অংশীদারিত্বর ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে এবং এই বিনিয়োগে প্রকৃত লোকসানের দায়ভারও ব্যাংক গ্রহণ করে। অপর দিকে প্রচলিত ব্যাংক বিনিয়োগের লাভ-লোকসানের দায়ভার গ্রহণ করে না। বরং বিনিয়োগের অর্থের উপর নির্ধারিত হারে সুদ আদায় করে।

ছয়: যাকাত ফান্ড: ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো তার নিজস্ব যাকাত ফান্ড রয়েছে। উক্ত ফান্ডে ব্যাংকের সম্পদ ও আয়ের যাকত এবং ব্যাংকের গ্রাহক ও জনগণের স্বেচ্ছাপ্রদত্ত যাকাতের অর্থ জমা হয়। এ অর্থ জনকল্যাণমূলক শরীয়তসম্মত খাতে ব্যয় করা হয়।

সাত: শরী‘য়াহ কাউন্সিল: ইসলামী ব্যাংকের সকল কর্যক্রম যেমন ব্যাংকের লেন-দেন, ব্যবসা-বাণিজ্য,অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মূলধন বা তহবিল বিনিয়োগ, নিজস্ব প্রকল্প স্থাপন ইত্যাদি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরুতেই গঠন করা হয় শরী‘আহ কাউন্সিল। কোনো কোনো ইসলামী ব্যাংকে এর নাম শরী‘আহ সুপারভাইজারী কাউন্সিল। এ বোর্ডে পাঁচ থেকে সাত জন্য সদস্য থাকে। এদের অধিকাংশ থাকেন প্রখ্যাত আলেম ও ফকিহ। বাকিদের মধ্যে থাকেন একজন ইসলামী অর্থনীতিবিদ, একজন অবিজ্ঞ ইসলামী আইবিদ এবং প্রবীণ ব্যাংকার। এ বোর্ড ব্যাংকে ইসলমী শরীয়ত অনুযায়ী চলার পরামর্শ দেন এবং ব্যাংক কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বা ভুল পথে চলতে চাইলে ব্যাংকের আর্টিকেলস অব এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী তাতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে এ বোর্ডের। 

আট: মুদ্রাস্ফীতির কারণ দূর করা: সুদি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার সাথে পণ্যের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকার কারণে পৃকৃত অর্থনৈতিক কর্যক্রম ছাড়াই নির্দিষ্ট হারে মুদ্রা বাড়তে থাকে। এর ফলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে যায়। আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম সমস্যা হলো এই মুদ্রাস্ফীতি। সৃষ্ট এই মুদ্রাস্ফীতির কারণে সমাজে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ পদ্ধতি পণ্যভিত্তিক, উৎপাদনমূলক ও শ্রমের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতি দূর হয়। 

নয়: জনকল্যাণমূলক শিল্পোদ্যোগ ও ব্যবসায়ে অংশ গ্রহণ: ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক অগ্রগতীর লক্ষ্যে বিভিন্ন শরীয়াহসম্মত লিল্পোদ্যোগ ও ব্যবসায় অংশগ্রহণ করা। অবশ্যাই এ ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগের সময় ঐসকল উদ্যোগ শরীয়াহসম্মত  এবং জনকল্যাণকর কিনা  সে দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মাদক দ্রব্যের ব্যবসা, চরিত্রবিধ্বংসী উপকরণ যেমন সিনেমা, নাচ-গান এবং জনস্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী উৎপাদন ইত্যাদি কাজে ইসলমী ব্যাংক ঋণ দেয় না। বরং শরীয়তসম্মত শিল্প, কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতিতে এ ব্যাংক সহযোগিতা করে থাকে। ব্যাংক দুইভাবে এটি করে। (১) লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বের চুক্তিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। (২) প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে। 

দশ: ইসলামী ব্যাংক একটি সামাজিক আন্দোলন: ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই নয়। বরং এটি সমাজে ইনসাফ ভিত্তিক ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার একটি সামাজিক আন্দোলনও বটে। সমাজের নিঃস্ব, অভাবী, বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের আর্থিক উন্নতির জন্য ইসলামী ব্যাংক বিশেষভাবে দায়িত্ব পালন করে। 

ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য:

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই লক্ষ্য উদ্দেশ্য রয়েছে। ইসলমী ব্যাংকও যেহেতু একটি ইসলামী আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাই তার ও কিছু লক্ষ্য উদ্দেশ্য আছে। তবে তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য হতে হয় ইসলামী শরীয়তসম্মাত।  কেবল অবাধভাবে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া ইসলমী ব্যাংক এর উদ্দেশ্য নয়। 
ইসলামী ব্যাংকে উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ:
১।অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে  ইসলামের বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করা। 
২। অভিশপ্ত সুদ থেকে মাবন সমাজকে মুক্ত করা। 
৩। ব্যবাসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। 
৪। সমাজের গরিব, অসহায়, বেকার ও পিছিয়ে পড়া মানুষের অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা।
৫। আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে শোষণের অবসান ঘটিয়ে আর্থ-সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। 
৬। শরীয়াসম্মত উৎপাদনশীল ও কল্যাণকর খাতে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা। 
৭। অর্থের মূল্যমানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। 
৮। ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা সম্পর্কের পরিবর্তে অংশীদারিত্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করা ।
৯। সুদের পরিবর্তে শ্রমকে আয়ের উৎস হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা। 
১০। অর্থ ব্যবস্থায় ধনীক আরো ধনী ও গরিবকে আরো গরিব হওয়ার পথ সৃষ্টি না করা। 
১১। শ্রমিকের মর্যাদা, অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 
১২। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করা। 
১৩। দেশে নতুন নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
১৪। ইসলামী ব্যাংকিংকে বিশ্বের বুকে ইসলামের মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর ব্যবস্থা করা। 
১৫। মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করে মুসলিম উম্মাহর উন্নতি ও অগ্রগতিতে অবদান রাখা। 

সুদী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের পার্থক্য:

ইসলাম একটি পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের নাম। ইসলামে মানব জীবনের সকল বিষয়ের দিক নির্দেশনা ও বিধি-বিধান রয়েছে। অর্থনীতি যেহেতু মানবজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ব্যবসা-বাণিজ্য, পারস্পারিক লেদ-দেন ইত্যাদিতে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধি-বিধান রয়েছে। সুদের প্রথা চালু থাকায় ইসলামের বিধি-বিধান মেনে এসব কাজে অংশগ্রহন করা মুসলমানদের জন্য অসম্ভব। তাই ইসলামী ব্যাংক এর সমাধানের জন্য এগিয়ে এসেছে। ইসলামী ব্যাংক ও সুদি ব্যাংকের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে পার্থক্যগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. সুদী ব্যাংকের কার্যক্রম ও পরিচালনা প্রণালী কোনো ধর্ম বিত্তিক নয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের সকল কার্যক্রম ও পরিচালনা প্রণালী ইসলামী শরীয়াহ বিত্তিক
২. সুদী ব্যাংকে বিনিয়োগকারী পূর্ব নির্ধারিত হারে সুদ পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে থাকে। আর ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তার মধ্যে ব্যবসার ঝুঁকি বন্টনকেই উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। 
৩. সুদী ব্যাংকে কোনো বাছ-বিচার ও বাধা-নিষেধ ছাড়াই মুনাফা সর্বোচ্চকরণ চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে থাকে। আর ইসলামী ব্যাংকে শরীয়াহর সীমারেখার মধ্যে থেকে মুনাফা সর্বোচ্চকরণ লক্ষ্য হয়ে থাকে। 
৪. সুদী ব্যাংকে যাকাতের কোনো সংশ্রব নেই। ইসলামী ব্যাংকে যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন অন্যতাম সেবামূলক কাজ। 
৫. অর্থ ধার দেওয়া এবং সুদসহ তা ফেরত পাওয়াই সুদী ব্যাংকের প্রধান কাজ। আর লাভ-লোকসানের অংশীদারী ব্যবসায়ে অংশগ্রহণই হলো ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কাজ। 
৬. সুদী ব্যাংকের কাজের পরিধি ইসলামী ব্যাংকের কাজের পরিধির তুলনায় অনেক সংকীর্ণ। ইসলামী ব্যাংক কার্যত: একটি বহুমূখী প্রতিষ্ঠান। 
৭. সুদী ব্যাংকে ঋণ খেলাপীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ বা চক্রবৃদ্ধি সুদ দাবী করতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে এই ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবী করার কোনো সুযোগ নাই। 
৮. সুদী ব্যাংকে ব্যক্তিস্বার্থই প্রায়শঃমুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তার জন্য এ ব্যাংকে উদ্যোগ বা কৌশল নেই। আর ইসলামী ব্যাংকে জনস্বার্থের উপর যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ব্যাংকের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা। 
৯. সুদী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মুদ্রাবাজার হতে ঋণগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ। আর ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এটি তুলনামুলক কঠিন। 
১০. সুদী ব্যাংকে প্রদেয় ঋণ হতে প্রকাশ্য আয় পূর্বনির্ধারিত হওয়ার ফলে প্রজেক্ট মূল্যায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব প্রদান করা মূখ্য বিষয় নয়। অপরদিকে ইসলামী ব্যাংকে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের নীতি ও কৌশল থাকায় প্রজেক্ট মূল্যায়ন ও দক্ষতা অর্জনের উপর সমাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। 
১১. সুদী ব্যাংকে মক্কেলের ‍ঋণ গ্রহণযোগ্যতার উপরই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর ইসলামী ব্যাংকে প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়নের উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়। 
১২. সুদী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মক্কেলের সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে ব্যাংকের স্ট্যাটাস হলো ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা। আর এ ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের স্ট্যাটাস হলো অংশীদারী বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা। 
১৩. সুদী ব্যাংকে সকল ধরনের আমানতের নিশ্চয়তার দিতে হয়। আর ইসলামী ব্যাংকে এর কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয় না। যথার্থভাবে বলতে গেলে ইসলামী ব্যাংক এটা করতেই পারে না। 
১৪. ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের পার্থক্য করা হয় না। আর ইসলামী ব্যাংক সকল বিনিয়োগে হারাম-হালালের বিষয়টি লক্ষ্য রাখে। 
১৫. সুদী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুলম ও শোষণের বিস্তার ঘটে। আর ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামাজিক সুবিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত হয়। 

ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ পদ্ধতি:

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সর্বসম্মত বিনিয়োগ পদ্ধতি প্রধানত দুই প্রকার। এক: মুশারাকা; দুই: মুদারাবা। এই দুইটি পদ্ধতি ছাড়াও ইসলামী ব্যাংক আরো কিছু বিনিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে, যেগুলো মুলত ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী। আর সেগুলো হলো: বাইয়ে মুরাবাহা, বাইয়ে মুয়াজ্জাল, বাইয়ে সালাম ও ইজারা।

মুশারাকা পদ্ধতি: মুশারাকা বলা হয় দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসার মুলধন যোগান দেওয়া। অর্থাৎ অংশীদারের ভিত্তিতে ব্যবসা করা। এই পদ্ধতিতে ব্যাংক এবং বিনিয়োগ গ্রাহক উভয়ই মূলধন যোগান দিবে এবং লাভের ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা বন্টন করবে। কিন্তু লোকসান হলে মূলধনের অনুপাতে ক্ষতি বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও বিনিয়োগ গ্রহীতা উভয়েই ব্যবসায় পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে আবার এক পক্ষ অপর পক্ষের প্রতিনিধি বা ট্রাস্টী হিসেবেও কাজ করতে পারে। 

মুদারাবা পদ্ধতি: মুদারাবা বল হয় একপক্ষ ব্যবসার পুঁজি যোগান দেওয়া; অপর পক্ষ তার মেধা, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে উক্ত পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করা । অর্থাৎ এক পক্ষের পুঁজি অপর পক্ষের শ্রম। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক যখন বিনিয়োগ করে তখন ব্যাংক হয় ছাহেবে মাল তথা পুঁজি সরবরাহকারী। আর গ্রাহক হয় মুদারিব। এ পদ্ধতিতে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা বন্টন করতে হয়। আর ক্ষতির ক্ষেত্রে মুদারিব বা গ্রাহকের অবহেলাজনিত কারণ ছাড়া ক্ষতি হলে উক্ত ক্ষতি বা লোকসান ব্যাংকের গ্রহণ করতে হবে। 

বাইয়ে মুরাবাহা পদ্ধতি: বাইয়ে মুরাবাহা বলা হয় লাভে বিক্রি করাকে। এই পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের ফরমায়েশ অনুসারে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয় করে এবং নির্ধারিত লাভসহ ঐ পণ্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে গ্রাহক তাৎক্ষণীক মূল্য পরিশোধ করে অথবা তাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। 

বাইয়ে মুয়াজ্জাল পদ্ধতি: বাইয়ে মুয়াজ্জাল মানে বাকিতে বিক্রি করা। অর্থাৎ বাইয়ে মুয়াজ্জালের ক্ষেত্রে গ্রাহক ব্যাংকের কাজ থেকে বাকিতে মাল ক্রয় করে থাকে। ব্যাংক গ্রাহকের হয়ে বিভিন্ন কাঁচামাল,পণ্য ইত্যাদি ক্রয় করে সেগুলো গ্রাহকের কাছে বাকিতে বিক্রি করে। উভয় জনের সম্মতিক্রমে মূল্য নির্ধারিত হয়। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহককে পণ্যের ক্রয়মূল ও মুনাফা পৃথকভাবে জানাতে বাধ্য নয়। অর্থাৎ শুধু বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করলেই চলবে। 

বাইয়ে সালাম পদ্ধতি: অগ্রিক ক্রয় করাকে বাইয়ে সালাম বলা হয় । এ পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের নিকট থেকে পণ্য ক্রয়ের জন্য অগ্রিম নির্ধারিত মূল্য প্রদান করে এবং গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে উক্ত পণ্য ডেলিভারী দেয়। এক্ষেত্রে পণ্যের গুণগুণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছাড়া এই চুক্তি বৈধ হবে। তাছাড়া পণ্যের মূল্য, ডেলিভারীর সময় ও পদ্ধতি ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়ের আগে থেকেই জানা থাকতে হয়। 

ইজারা: এ পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক স্থানান্তর যোগ্য সম্পত্তি ক্রয় করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রাহকের কাছে ভাড়া দেয়। সময় শেষ হলো উক্ত সম্পত্তি ব্যাংক ফেরত পায়। 

ব্যাংকে প্রচলিত কার্ডসমূহের ইসলামী বিধান জানতে এটি পড়ুন


Post a Comment

0 Comments