Ticker

6/recent/ticker-posts

কোরবানির নিয়ম কানুন ও মাসয়ালা মাসায়েল

কোরবানির নিয়ম কানুন ও মাসয়ালা মাসায়েল


কোরবানির নিয়ম কানুন ও মাসয়ালা মাসায়েল।

কোরবানির পরিবচয়:

‘কোরবানি’ মূলত  (قرباني ) এটি উর্দূ ও ফার্সি ভাষায় ব্যবহার হয়। এটি আরবি শব্দ قرب  قربان থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো সান্নিধ্য বা নৈকট্য। তবে আরবি ভাষায় উদহিয়া الأضحية শব্দটি কোরবনি অর্থে অধিক প্রসিদ্ধ। 
শরিয়তের পরিভাষায় কোরবনি বলা হয় কোরবানির নির্দিষ্ট ‍দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের প্রত্যাশায় বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে পশু জবাই করা।
কোরআনে কোরবানিকে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে, যেমন:
১) নাহার نحر শব্দে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 
 فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ অর্থ: সুতরাং আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ এবং কোরবানি আদায় করুন। 
(সূরা কাউসার:আয়াত ২)
২) নুসুক نسك শব্দে । যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 
 قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ  অর্থ: ( হে নবী ) আপনি বলুন! নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার জন্য। (সূরা আনআ’ম: আয়াত১৬২)
৩) মানসাক (منسك) শব্দে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:  وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا  অর্থ: আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান রেখেছি। (সূরা হজ: আয়াত৩৪)
৪) কুরবানান {قُرْبَانًا} শব্দেও ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: 
 وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ  অর্থ: (হে নবী) তুমি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তাদের যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্য জনের কোরবানি কবুল হলো না। (সূরা মায়েদা; আয়াত২৭) 

কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: 

পৃথিবীর প্রথম মানব  হযরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কোরবানির সূচনা হয়। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে যত নবী রাসূল পাঠিয়েছে সকলের শরীয়তেই কোরবানির বিধান ছিলো। তবে প্রত্যেক নবী রাসূলগণের শরিয়তে কোরবানির পদ্ধতি ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। সর্বশেষ হযরত মুহাম্মা (সা.) এর মাধ্যমে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর আদর্শ অনুযায়ী  ইসলামে যে পদ্ধতিতে কোরবানির বিধান দেওয়া হয়েছে সেটিই কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। 
হযরত আদম (আ.) এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কোরবানির নির্দেশ দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: (হে নবী) তুমি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তাদের যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্য জনের কোরবানি কবুল হলো না। 
(সূরা মায়েদা; আয়াত২৭)
হযরত আদম (আ.) এর ঘরে প্রতিবারে দুইটি করে সন্তান জন্ম গ্রহণ করত, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। আর তাদের বিবাহের নিয়ম ছিলো প্রথবারের ছেলে দ্বিতীয় বারের মেয়েকে এবং দ্বিতীয় বাররে ছেলে প্রথম বারের মেয়েকে বিবাহ করত। তখন আদম  (আ.) এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহ নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়। কাবিলের সাথে জন্মগ্রহণ করা বোনটি ছিলে সুন্দরী। তাই কাবিল চেয়েছিল বিবাহের উল্লেখিত নিয়ম ভঙ্গ করে তার সাথে জন্মগ্রহণ করা বোনটিকে বিবাহ করার জন্য। এই নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য উভয়কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। যার কোরবানি কবুল হবে সে-ই সুন্দরী বোনটিকে বিবাহ করবে। উভয়ে কোরবানি দিলো। হাবিল কোরবানি করল একটি মোটা তাজা ভেড়া আর কাবির কোরবানি করল তার চাষের কিছু ফসল। তখন নিয়ম ছিলো যার কোরবানি কবুল হতো আকাশ থেকে আগুন এসে তার কোরবানি গ্রাস করে ফেলত। সেই সূত্রে হাবিলের কোরবানি কবুল হলো আর কাবিলের কোরবানি প্রত্যাক্ষিত হলো। এখান থেকেই কোবানির সূচনা। 
আর বর্তমানে ইসলামী শরিয়তে যে নিয়মে কোরবানির বিধান রয়েছে তার সূচনা হয়ে ছিলো হযরত ইরবাহিম (আ.) থেকে। একদা আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধু হযরত ইবরাহিম (আ.) কে স্বপ্নে নির্দেশ দিলেন তার প্রিয় বস্তু কোরবানি করার জন্য। তখন ইবরাহি (আ.) ১০টি উট কোরবানি দিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিন তিনি একই স্বপ্ন দেখলেন। তখন তিনি ১০০ উট কোরবানি দিলেন। তৃতীয় দিনও যখন তিনি একই স্বপ্ন দেখলেন তখন তিনি বুঝলে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে বৃদ্ধ বয়সে জন্মগ্রহণ করা প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহর জন্য কোরবানি করার নির্দেশ দিচ্ছেন। 
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন: সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। অতপর সে পুত্র যখন ইবরাহিমের সাথে চলাফেরা করার উপযুক্ত হলো, তখন সে (ইবরাহিম) বলল, হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখলাম তোমাকে কোরবানি করছি। এবার চিন্তা করে বলো তোমার অভিমত কী। সে (ইসমাইল) বলল, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। সুতরাং (সেটা ছিলো এক বিস্ময়কর দৃশ্য) যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং পিতা পুত্রকে (কোরবানি করার জন্য) কাত করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এক স্পষ্ট পরিক্ষা। অতপর আমি এক মহা কোরবানির পশুর বিনিময়ে সে শিশুকে মুক্ত করলাম।
(সুরা আস-সাফফাত:১০১-১০৭)

কোরবানির ফজিলত: 

কোরআন ও হাদিসে কোরবানির বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
১। কোরবানি মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। আল্লাহ তালায়া পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ 
অর্থ: সুতরাং আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ এবং কোরবানি আদায় করুন।
 (সূরা কাউসার:আয়াত ২)

২। কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে নেকি দেওয়া হয়। 
عن زيد بن أرقم، قال: قال أصحاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم -: يا رسول الله، ما هذه الأضاحي؟ قال: "سنة أبيكم إبراهيم" قالوا: فما لنا فيها يا رسول الله؟ قال: "بكل شعرة حسنة" قالوا: فالصوف يا رسول الله؟ قال: "بكل شعرة من الصوف حسنة"
হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীগণ রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! কোরবানি কী? রাসূল (সা.) বললেন: এটি তোমাদের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সুন্নাত। অতপর তারা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কি পরিমাণ প্রতিদান রয়েছে? রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন: প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি করে নেকী দেওয়া হয়। অতপর সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! পশমের বিনিময়েও কি সাওয়াব দেওয়া হবে? জবাবে আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন: হ্যাঁ, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী দেওয়া হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ; হাদিস নং ৩২৪৭)

৩। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার সাথে সাথে সগিরাহ গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাযি.) থেকে বণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) হযরত ফাতেমা (রাযি.) বললেন: 
  «قومي إلى أضحيتك فاشهديها فإن لك بأول قطرة تقطر من دمها يغفر لك ما سلف من ذنوبك» قالت: يا رسول الله، هذا لنا أهل البيت خاصة أو لنا وللمسلمين عامة؟ قال: «بل لنا وللمسلمين عامة
অর্থ: (হে ফাতেমা) তুমি তোমার কোরবানির জন্তু জবেহ করার স্থানে উপস্থিত থাকো। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার অতীতের সব (সগীরাহ) গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন। তখন ফাতিমা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই গুনাহ ক্ষমা হওয়ার বিষয়টি শুধু আমাদের আহলে বায়াতের  জন্য বিশেষত, নাকি সব মুসলমানের জন্য? নবীজি বললেন, আমাদের ও সব মুসলমানের গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (মুস্তাদরাক হাকিম, হাদিস : ৭৭৩২)

৪। কোরাবানি আল্লাহর নিকট অতি প্রিয় আমল। 
হযরত আয়েশা (রাযি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
 "ما عمل ابن آدم يوم النحر عملا أحب إلى الله عز وجل من هراقة دم، وإنه لتأتي يوم القيامة بقرونها وأظلافها وأشعارها، وإن الدم ليقع من الله عز وجل بمكان، قبل أن يقع على الأرض، فطيبوا بها نفسا"
অর্থ: কোরবানির দিন আল্লাহ কাছে আদম সন্তানের  সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোরবানি করা। কিয়ামতের দিন জবাইকৃত পশু তার শিং, খুর ও পশমসহ হাজির হবে। নিশ্চয়ই কোরবানির পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তায়ালার নিকট তা কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা খুশি মনে ও আনন্দচিত্তে কোরবানি করো। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩১২৬)  

৫। কোরবানি কোরবানিদাতার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে।
 عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ حَسَنِ بْنِ حَسَنٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ جَدِّهِ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ ضَحَّى طَيِّبَةً بِهَا نَفْسُهُ ، مُحْتَسِبًا لأُضْحِيَّتِهِ ؛ كَانَتْ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ.

অর্থ: আবদুল্লাহ ইবনে হাসান (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি খুশি মনে সওয়াবের প্রত্যাশায় কোরবানি করবে, ওই কোরবানির জবেহকৃত পশু কোরবানিদাতার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে।’ (আল মুজামুল কাবির, হাদিস : ২৭৩৬) 
 
৬। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছে:

 أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ قَالَ : مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ ، وَلَمْ يُضَحِّ ، فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا.
অর্থ: যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরাবানি দিলো না সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (ইবনে মাজাহ:১৭২১)

 ৭। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) বলেন: রাসূল (সা.) মদিনায় দশ বছর জীবন যাপন করেছেন, প্রতি বছরই তিনি পশু কোরবানি করেছেন। (তিরমিযী: ৩/১৪৪) 

কোরবানি কার উপর ওয়াজি:

কারো উপর কোরাবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নের শর্তগুলো থাকা আবশ্যক। এই শর্তগুলো থাকলেই কেবল কোরবানি ওয়াজিব হবে। অন্যথায় নয়। 
শর্তগুলো হলো:
১। মুসলমান হওয়া। সুতরাং অমুসলিমের উপর কোরবানির বিধান প্রযোজ্য নয়। 
২। বালেগ তথা প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়া। অতএত অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক কোনো ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। 
৩। আকেল তথা সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া। অতএবং পাগল ব্যক্তি ধনী হলেও তার উপর কোরাবানি ওয়াজিব নয়। 
৪। মুকিম হওয়া। অতএব মুসাফিরের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। 
৫। স্বাধীন হওয়া। সুতরাং কোনো দাসের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। 
৬। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। অর্থাৎ যাকাত ফরজ হয় এ পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। আর তা হলো সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা থাকা অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব সম্পদ মিলে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের হওয়া। অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সমমূল্যের নগদ অর্থ বা বাড়ি কিংবা ব্যবসায়িক পণ্য অথবা অন্যান্য আসবাবপত্রের মালিক হলেই তার কোরবানি ওয়াজিব হবে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি  ১০ জিলহজ ফজরের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক তাহলেই তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোরবানির ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়।

কোন কোন পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে:

সকল ওলামায়ে কেরাম একমত যে, নিম্নে বর্ণিত পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে। এগুলো ছাড়া অন্য পশু দ্বারা কোরবানি হবে না। 
১। ‍উট
২। গরু
৩। মহিষ
৪। ছাগল
৫। ভেড়া 
৬। দুম্বা
 উল্লেখিত যে কোনো পশু কোরবানি করা যাবে সেটা নর পশু হোক বা মাদী। তবে অবশ্য সেটা গৃহপালিত পশু হতে হবে। বন্য বা জংলি হিংস্র পশু  জংলি গরু বা হরিণ কিংবা ঘোড়া  ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি জায়েয নয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন:
{ وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ}
অর্থ: আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান দিয়েছে যাতে আল্লাহ তাদেরকে যে ‘বাহিমাতুল আনআম’ (অহিংস্র চতুষ্পদ জন্তু) দিয়েছেন তাতে তারা ‍আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। 
(সূরা হজ্ব, আয়াত নং ৩৪) 
এখানে বাহিমাতুল আনআম দ্বারা উল্লেখিত পশুগুলোকে বুঝানো হয়েছে। তাছাড়া রাসূল (সা.)সহ তাঁর কোনো সাহাবী (রাযি.) থেকে উল্লেখিত পশুগুলো ছাড়া অন্য কোনো পশু দ্বারা কোরবানি করার কথা প্রমাণিত নয়। (আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু: ৪/২৭১৯)

কোন ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি হবে না:

চার ধরনের পশু দ্বারা কোরাবানি হবে না। 
১। অন্ধ
২। রোগা 
৩। পঙ্গু
৪। আহত
কারণ হযরত বারা ইবনে আজেব (রাযি.) থেকে বণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
 أربع لا تجزئ في الأضاحي: العوراء، البين عورها، والمريضة، البين مرضها، والعرجاء، البين ظلعها، والكسيرة، التي لا تنقي 
অর্থ চার ধরনের পশু কুরবানী জায়েয নয়, কানা পশু যার কানা হওয়াটা সুস্পষ্ট, রুগ্ন যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার খোঁড়া হওয়া সুস্পষ্ট; দুর্বল, যার হাঁড়ে মজ্জা নেই। (ইবনে মাজাহ:২/১০৫০)

যে ধরনের পশু কোরবানি করা উত্তম:

কোরবানির মানেই হলো প্রিয় জিনিস আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা। তাই কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে উত্তম হলো হৃষ্টপুষ্ট,সুন্দর, সুন্দর শিং বিশিষ্ট ও নর পশু কোবানি দেওয়া।

কারণ ভিবিন্ন হাদিসে এসেছে রাসূল (সা.) এ ধরনের পশু কোরবানি করতেন। 
যেমন হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত:
ضَحَّى بِكَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ يَذْبَحُ وَيُكَبِّرُ وَيُسَمِّي وَيَضَعُ رِجْلَهُ عَلَى صَفْحَتِهِمَا
অর্থ: রাসূল (সা.) সাদা-কালো রংয়ের দুই শিং বিশিষ্ট দুইটি নর দুম্বা কোরবানি করেছেন। যবেহ করার সময় তিনি বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলেছেন এবং তাঁর পা পশুর ঘাড়ের উপর রেখেছেন।
 (আবু দাউদ শরিফ:৩/৯৫, হাদিস নং ২৭৯৪)

হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন:
عن أبي هريرة، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان «إذا أراد أن يضحي، اشترى كبشين عظيمين، سمينين، أقرنين، أملحين موجوءين،
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন কোরবানির ইচ্ছা করতেন তখন বড়, মোটা-তাজা এবং শিং বিশিষ্ট ‍সুন্দর দুইটি দুম্বা ক্রয় করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩১২২)

যে ধরনের পশু কোবানি করা মাকরূহ:

১। কান কাটা পশু দ্বারা 
২। লেজ কাটা পশু দ্বারা। 
৩। শিং ভাঙ্গা পশু দ্বারা । 
৪। ওলান বা লিঙ্গ কাটা পশু দ্বারা। 
কারণ হাদিস শরিফে এসেছে হযরত আলি (রাযি.) বলেন: 
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَسْتَشْرِفَ الْعَيْنَ وَالْأُذُنَ وَأَنْ لَا نُضَحِّيَ بِمُقَابَلَةٍ وَلَا مُدَابَرَةٍ وَلَا بَتْرَاءَ وَلَا خَرْقَاءَ
অর্থ: রাসূল (সা.) আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন, আমরা যেন কোরবানির পশুর চোখ ও কান ভালোভাবে দেখে নেই। আর আমরা যেন কানের সামনের ভাগ কাটা, কানের পেছন ভাগ  কাটা, লেজ কাটা এবং কানের গোড়া থেকে কাটা পশু কুরবানী না করি। 

কোরবানির পশুর বয়স।

ইসলামী শরিয়তে কোরবানি জায়েয হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বয়সের পশু কোরবানি করতে হয়। উক্ত বয়সের কম হলে ওই পশু দ্বারা কোরবানি জায়েয হবে না। কোরবানির পশুর সর্বনিম্ন বয়স কত হতে হবে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো। 
১। উট। উট কোরবানি করলে অবশ্যই তার বয়স সর্বনিম্ন পাঁচ বছর হতে হবে। পাঁচ বছর চেয়ে কম বয়সী উট দ্বারা কোবারনি জায়েয নয়। 
২। গরু-মহিষ। অর্থাৎ গরু ও মহিষ সর্বনিম্ন দুই বছর বয়সী হতে হবে। দুই বছরের কম বয়সী গরু বা মহিষ দ্বারা কোরবানি জায়য হবে না। 
৩। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। এগুলোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বনিম্ন এক বছর হতে হবে। তবে যদি এক বছরের ভেড়া ও দুম্বা পাওয়া না যায় তাহলে কম বয়সী এমন মোটা-তাজা ভেড়া ও দুম্বা কোরবানি করা যাবে যেগুলো দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়। অবশ্য সে ভেড়া ও দুম্বার বয়সও ছয় মাসের কম হওয়া যাবে না। আর ছাগল যতই মোটা তাজা হোক না কেনো এক বছরের কম বয়সী ছাগল ছাড়া কোরবানি হবে না।  
কারণ হাদিস শরিফে হযরত জাবের (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: 
«لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ»
অর্থ: তোমরা ‘মুসিন্নাহ’ ছাড়া কোরবানি করবে না। তবে যদি মুসিন্নাহ সংগ্রহ করতে কষ্টকর হয় তবে মেষের ‘জাযাআহ’ কোরবানি করতে পারো। (সুনানে আবি দাউদ:হাদিস নং ২৭৯৭)
আরবী ভাষাবিদ ও ফুকাহায়ে কেরামদের মতো মুসিন্নাহ বলা হয় পাঁচ বছরের উট, দুই বছরের গরু/মহিষ এবং বছরের ছাগল, ভেড়া ও দুম্বাকে। আর ‘জাযাআহ’ বলা হয় ছয় মাসের হৃষ্টপুষ্ট এমন দুম্বা বা ভেড়াকে যা দেখতে এক বছর বয়সী মনে হয়। 

 ভাগে কোরবানি দেওয়ার নিয়ম।

ভাগে কোরবানি দেওয়ার অর্থ হলো একটি পশুতে মালিকানার ভিত্তে একাধিক ব্যক্তি অংশিদার হয়ে কোরবানি করা। ছাগল ভেড়া, দুম্বা এই প্রাণীগুলোতে শুধু একজন ব্যক্তি অংশিদার হয়ে কোরবানি করতে পারবে। একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি করলে কোরবানি হবে না। আর উট,গরু ও মহিষের মধ্যে সর্বোচ্চ সাত জন্য ব্যক্তি অংশিদার হতে পারবে। কারণ হাদিস শরিয়ে এসেছে:
عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُهِلِّينَ بِالْحَجِّ: «فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَشْتَرِكَ فِي الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ، كُلُّ سَبْعَةٍ مِنَّا فِي بَدَنَةٍ
অর্থ: হযরত জাবের (রাযি.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে হজের সফরে ছিলাম। তখন রাসূল (সা.) আমাদেরকে আদেশ দিলেন, আমরা যেন উট ও গরু কোরবানি করার ক্ষেত্রে সাত জন্য শরীক হই। (সহিহ মুসলিম: ২/৯৫৫)

অপর এক বর্ণনাতে হযরত জাবের (রাযি.) বলেন:
نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْحُدَيْبِيَّةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ
অর্থ: আমরা হুদায়বিয়ায় রাসূল (সা.) সাথে এক একটি উটে সাত জন শরিক হয়ে এবং এক একটি গরুতে সাত জন্য শরিক হয়ে কোরবানি করেছি। (সুনানে আবি দাউদ: ৩/৯৮) 

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: شَهِدْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْأَضْحَى بِالْمُصَلَّى، فَلَمَّا قَضَى خُطْبَتَهُ نَزَلَ مِنْ مِنْبَرِهِ وأُتِيَ بِكَبْشٍ فَذَبَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ، وَقَالَ: «بِسْمِ اللَّهِ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، هَذَا عَنِّي، وَعَمَّنْ لَمْ يُضَحِّ مِنْ أُمَّتِي
অর্থ: হযরত জাবের (রাযি.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) এর সাথে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। যখন তিনি খুৎবা শেষ করে মিম্বার থেকে নামলেন তখন একটি ভেড়া নিয়ে আসা হলো। রাসূল (সা.) সেটি বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে নিজ হাতে জবেহ করলেন এবং বললেন: এই কোরবানিটি আমার এবং আমর উম্মতের মধ্যে যারা কোরবানি করতে অক্ষম তাদের পক্ষ থেকে। 
(সুনানে আবি দাউদ: ৩/৯৯)
সুতরাং ছগাল, ভেড়া ও দুম্বা কোরবানি করতে হবে একজনের জনের পক্ষ থেকে আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে।

কোরবানির গোশত বন্টনের পদ্ধতি। 

কোরবানির গোশত বন্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি হলো গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা। একভাগ নিজে রাখা, একভাগ গরিব লোকদেরকে সদকা করা, আরেক ভাগ প্রতিবেশি ও আত্ময়-স্বজনকে হাদিয়া দেওয়া। এ তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব। তবে কেউ যদি কোরবানি গোশত তিন ভাগে ভাগ না করে তাহলে তার কোরবানিতে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু ভাগ করে গরিব অসহায় লোকদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়াই উত্তম। কারণ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরবানে ইরশাদ করেছেন:
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ  
অর্থ: সুতরাং (হে মুসলমানগণ ) সেই (কোরবানির) পশুগুলো থেকে তোমারা নিজেরা খাও এবং অসহায়-অভাবগ্রস্থদেরকে খাওয়াও। (সূরা হাজ্জ:১৪) 

 فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ 
অর্থ: সুতরাং (গোশত) থেকে তোমরা নিজেরাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্থদেরও খাওয়াও। 
(সূরা হজ্জ:৩৬)

তাছাড়া বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) কোরবানির গোশত তিন ভাগ করতেন। একভাগ নিজেদের জন্য রাখতেন, একভাগ গরিব অসহাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন আরেক ভাগ আত্মী-স্বজন ও প্রতিবেশিদেরকে হাদিয়া দিতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি) বলেন:  
  (ويطعم أهل بيته الثلث، ويطعم فقراء جيرانه الثلث، ويتصدق على السؤَّال بالثلث» (رواه أبو موسى الأصفهاني في "الوظائف.
অর্থ: রাসূল (সা.) কোরবানি গোশতের তিনভাগের একভাগ খাওয়াতেন তাঁর পরিবার পবিরজনকে, এক ভাগ খাওয়াতেন প্রতিবেশি অভাবগ্রস্থ লোকদেরকে আরেক ভাগ সদকা করতেন গরিবদেরকে। 
(আবু মুসা আসফাহানী (রহ) আল অজায়েফ গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন)

অমুসলিমকে কোরবানির গোশত দেওয়ার বিধান:

আমাদের মুসলিম সমাজের আশপাশে অনেক গরিব অসহায় অমুসলিম বা হিন্দুলোক বসবাস করে। তাদেরকে কোরবানির গোশত এবং সদকাতুল ফিতির দেওয়া যাবে কিন্তু জাকাত দেওয়া যাবে না। তবে তারা যে সকল প্রাণীর গোশত খায় না তাদেরকে না জানিয়ে ঐ প্রাণীর গোশত না দেওয়াই শ্রেয়।
 (হেদায়া:১/১১১; আল বাহরুক রায়েক:২/২৬১; বাদায়ে সানায়ে :২/৫০৩, ফাতওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ:৬/২০৪)

কোরবানির গোশত কতদিন খাওয়া যাবে:

কোরবানির গোশত যতদিন খুশি ততদিনই ফ্রিজে সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ইসলামের শুরু যুগে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল না থাকার কারণে রাসূল (সা.) কোরাবানির গোশত দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন এবং তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করে রাখতে নিষেধ করে ছিলেন। কিন্তু যখন মুসলমানদের মাঝে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসল তখন রাসূল (সা.) এই নিষেধাজ্ঞা রহিত করে দিয়েছে। 
 এ সম্পর্কে কিছু হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
 হযরত সালামাহ ইবনুল আকওয়া (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ ضَحَّى مِنْكُمْ فَلاَ يُصْبِحَنَّ بَعْدَ ثَالِثَةٍ وَبَقِيَ فِي بَيْتِهِ مِنْهُ شَيْءٌ» فَلَمَّا كَانَ العَامُ المُقْبِلُ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، نَفْعَلُ كَمَا فَعَلْنَا عَامَ المَاضِي؟ قَالَ: «كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا، فَإِنَّ ذَلِكَ العَامَ كَانَ بِالنَّاسِ جَهْدٌ، فَأَرَدْتُ أَنْ تُعِينُوا فِيهَا

অর্থ: তোমাদের মধ্যে যে লোক কোরবানি করেছে, সে যেন তৃতীয় দিনে এমন অবস্থায় সকাল না করে যে, তার ঘরে এখনো কোরবানির গোশত রয়ে গেছে। (অর্থাৎ তিন দিনেরে বেশি যেন সংরক্ষণ না করে) পরবর্তী বছর সাহাবীগণ রাসূল (সা.) কে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গত বছর যা করেছি এ বছরও কি তাই করব? তখন রাসূল (সা.) বললেন: তোমারা নিজেরা খাও, অন্যদেরকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করে রাখো। নিশ্চয় গত বছর মানুষের অভাব অনটন ছিল তাই আমি চেয়ে ছিলাম তোমরা যেন তাতে সহযোগিতা করো। (সহিহ বুখারি:৭/১০৩)  

 عن عَائِشَةَ، تَقُولُ: دَفَّ أَهْلُ أَبْيَاتٍ مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ حَضْرَةَ الْأَضْحَى زَمَنَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ادَّخِرُوا ثَلَاثًا، ثُمَّ تَصَدَّقُوا بِمَا بَقِيَ»، فَلَمَّا كَانَ بَعْدَ ذَلِكَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ النَّاسَ يَتَّخِذُونَ الْأَسْقِيَةَ مِنْ ضَحَايَاهُمْ، وَيَجْمُلُونَ مِنْهَا الْوَدَكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَمَا ذَاكَ؟» قَالُوا: نَهَيْتَ أَنْ تُؤْكَلَ لُحُومُ الضَّحَايَا بَعْدَ ثَلَاثٍ، فَقَالَ: «إِنَّمَا نَهَيْتُكُمْ مِنْ أَجْلِ الدَّافَّةِ الَّتِي دَفَّتْ، فَكُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا
অর্থ: হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল (সা.) এর যমানায় বেদুঈনদের একটি দল কুরবানীর সময় উপস্থিত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কোরবানির গোশত খাও এবং (খাওয়ার জন্য) তিন দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখতে পারো। পরের বছর লোকেরা বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল ! মানুষ তাদের কুরবানী দ্বারা উপকৃত হয়। তার চর্বি গলায় এবং তা দ্বারা মশক তৈরি করে। তখন রাসূল (সা.) বললেনঃ তো কী হলো? লোকজন বললোঃ আপনি তো কুরবানীর গোশত সংরক্ষণ করে রাখতে নিষেধ করেছেন। তিনি বললেন, আমি তো নিষেধ করেছিলাম ঐ লোকদের জন্য, যারা আগমন করেছিল। এখন তোমরা খাও, সংরক্ষণ করে রাখো  এবং সাদকা করো। 
(সহিহ মুসলিম:৩/১৫৬১)

عن نبيشة, قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إنا كنا نهيناكم عن لحومها أن تأكلوها فوق ثلاث, لكي تسعكم, فقد  جاء الله بالسعة, فكلوا وادخروا واتجروا, 
অর্থ:হযরত নুবাইশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন: আমি তোমাদেরকে কোরবানির গোশত দিন দিনের বেশি খেতে নিষেধ করে ছিলাম যেন গোশত তোমাদের সবার কাছে পৌঁছে যায়। এখন আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দিয়েছেন। সুতরাং এখন তোমরা গোশত খাও, সংরক্ষণ করে রাখো এবং গোশত সদকা করে সাওয়াব অর্জন করো। (সুনানে আবি দাউদ:১/৬০৫)

কোরবানি করতে না পাররে কি করবে?

কারো উপর যদি কোরাবনি ওয়াজিব হয় আর সে কোনো কারণে কোরবানির পশু ক্রয় করতে পারেনি তাহলে একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা তার উপর ওয়াজিব। আর যদি কোরবানির পশু ক্রয় করে থাকে কিন্তু কোনো কারণে কোবারনির দিনগুলোত কোরবানি করতে পারেনি তাহলে পশুটি জীবিত অবস্থায় সদকা করে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৪;)

কোরবানির পশুর পেটে বাচ্চা পাওয়া গেলে কি করবে।

গর্ববতী পশু কোরবানি করতে কোনো অসুবিধা নেই, তবে প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে উক্ত পশু কোরবানি করা মাকরূহ। পশু কোরবানি করার পর পেটে মৃত বাচ্চা পাওয়া গেলে বাচ্চাটি ফেলে দিতে হবে। আর যদি বাচ্চাটি জীবিত থাকে তাহলে বাচ্চাটি জবেহ করে খেতে পারবে (কাযীখান ৩/৩৫০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৮৭; রদ্দুল মুহতার ৩/৬৫৬)
এ সম্পর্কে আবু সাঈদ খুদরী বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা উটনী, গাভী ও ছাগী জবেহ করি এবং কখনো কখনো আমরা তার পেটে বাচ্চা পাই। আমরা ঐ বাচ্চা ফেলে দিব, না খাব? রাসূল (সা.) বললেন, ‘তোমরা ইচ্ছা করলে খেতে পারো। কারণ বাচ্চার মাকে যবেহ করা বাচ্চাকে যবেহ করার শামিল’ (আবুদাউদ হা/২৮২৮; মিশকাত হা/৪০৯১-৯২)।
ইমাম আবু হানিফ (রহ.) এর অভিমত হলো  বাচ্চাটি জবেহ করে খেতে হবে। জবেহ না করে খাওয়া যাবে না। 

কোরবানির পশুর চামড়ার বিধান:

কোরবানির পশুর চামড়া দাবাগত বা প্রসেসিং করে নিজে ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারবে। কিন্তু চামড়া বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা নিজে উপকৃত হতে পারবে না। বরং বিক্রি করলে তার মূল্য গরিব তথা যারা যাকাত ফিতরার হকদার তাদেরকে সদকার করে দিতে হবে। কোরবানির পশুর কোনো অংশ দ্বারা কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। কোরবানির পশুর চামড়া সম্পর্কে রাসূল (সা.) থেকে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:

  قال رسول صلى الله عليه وسلم: وَتَمَتَّعُوا بِجُلُودِهَا، وَلَا تَبِيعُوهَا
অর্থ: রাসূল (সা.) বলেছেন: তোমরা কোরবানির পশুর চামড়া দ্বারা উপকৃত হও, তবে (তার মূল্য নিজে খরচ করার জন্য) তা বিক্রি করে দিও না। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ:৪/২৬)

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «من باع جلد أضحيته فلا أضحية له
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি (মূল্য নিজে খরচ করার জন্য) কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করবে তার কোরবানি হবে না। ( মুসতাদরাকে হাকেম:২/৪২২)

عن عَلِيّ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَهُ أَنْ يَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ وَأَنْ يَقْسِمَ بُدْنَهُ كُلَّهَا لُحُومَهَا وَجُلُودَهَا وَجِلاَلَهَا وَلاَ يُعْطِيَ فِي جِزَارَتِهَا شَيْئًا
অর্থ: হযরত আলি (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) তাকে রাসূল (সা.) এর কোরবানির পশুর রক্ষণাবেক্ষণ করার এবং তার সমস্ত গোশত, চামড়া ও পিঠের চট (সদকা হিসেবে) বন্টন করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এগুলো থেকে যেন কসাইকে তার (পারিশ্রমিক হিসেবে) কিছু না দেওয়া হয় তার আদেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম:২/৯৫৪)

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে কোরবানি করার তাওফিক দান করুক।




 

  





 

Post a Comment

0 Comments