Ticker

6/recent/ticker-posts

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ ও তার উপকারিতা:



ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ ও তার উপকারিতা।

ইসলামে বিবাহ নিছক যৌন চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয় । বরং ইসলাম বিবাহকে পূণ্য অর্জনের এক বিশাল মাধ্যম বানিয়েছে এবং মোহাম্মদ (সা.)সহ সকল নবীদের এক বিশেষ সুন্নাত হিসাবে ঘোষণা করেছে। কোরআনে  ইরশাদ করা হয়েছে: (হে মুহাম্মদ) তোমার আগেও আমি বহু রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দিয়েছি (সূরা রা’দ ৩৮) তা ছাড়া রাসূল (সা.)ও হাদিসে ইরশাদ করেছেন: বিবাহ আমার সুন্নাত, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত পালন করবে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। (ইবনে মাজাহ:৫৯২) ইসলাম মানুষকে বিভিন্নভাবে বিবাহরে প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত (তারা পুরুষ হোক বা নারী) তাদের বিবাহ সম্পাদন করো এবং তোমাদের গোলাম-বাদীদের মধ্যে যারা বিবাহের উপযুক্ত, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাব মুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ। (সূরা নূর:৩২)
মুসলিম উম্মাহকে অনুপ্রাণিত করে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি বিবাহ করল সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করল। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে যেন সে আল্লাহকে ভয় করে। (মেশকাত:২/২৬৮) 

বিবাহের উপকারিতা:
বিবাহের বহু উপকারিতা রয়েছে। নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু উপকারিতা উল্লেখ করা হলো।

একঃ বিবাহ মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখার মাধ্যম।

বিবাহের মাধ্যমেই যুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতা টিকে আছে এবং মানুষের বংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পৃথিবীর রাজত্ব দিচ্ছেন। আর এটা সুস্পষ্ট যে, এই বংশ বিস্তার এবং এই ধারাবাহিকতাই সুস্থ মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা সামাজিক এই তাৎপর্যের কথা এবং মানবতার কল্যাণের কথা কোরআনে বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন। তিনি ইরশাদ করেন: আল্লাহ তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের স্ত্রীদের থেকে তোমাদের জন্য পুত্র ও পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন। (সূরা নাহল:৭২)
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন: হে লোক সকল! নিজ প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি হতে এবং তারই থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করছেন। আর তাদের উভয় থেকে বহু নর-নারী দুনিয়াতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা নিসা:১)

দুই: বিবাহ দ্বারা বংশ সংরক্ষণ হয়।

আল্লাহ তায়ালা যে বিবাহকে বৈধ করেছেন সে বিবাহের মাধ্যমে সন্তানরা নিজেদেরকে নিজেদের পিতার দিকে সম্বোধন করতে পারে এবং বংশের মাধ্যমে গর্ববোধ করতে পারে। আর এই বংশ পরিচয়ের দ্বারাই তারা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান পায় এবং নিজেরা মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে। সুতরাং বৈধ বিবাহের ব্যবস্থা না থাকলে সমাজ বংশহীন, সম্মানহীন ও আত্নমর্যাদাহীন জারজ সন্তান দ্বারা ভরে যেতো। তখন এটা উত্তম চরিত্রের জন্য বিশাল এক হুমকি হয়ে দাড়াতো এবং সমাজের মধ্যে পাপাচার ও নৈরাজ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তো ।

তিনঃ সমাজ নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা পায়।

বিবাহের দ্বারা সমাজ নৈতিক অনাচার থেকে রক্ষা পায়  এবং মানুষ সামাজিকভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে নিরাপদ থাকে। কোনো জ্ঞানসম্পূন্ন ব্যক্তির কাছে এটা অস্পষ্ট নয় যে, যখন যৌন চাহিদা পূরণ হবে বৈধ বিবাহ ও হালাল মিলনের মাধ্যমে,তখন প্রতিটি সমাজ ও সমাজের মানুষ উত্তম আদর্শ  ও সুন্দর চরিত্র দ্বারা অলংকৃত হবে। তখন সে জাতি দ্বীন-ধর্ম প্রচারে এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে যে (খেলাফতের) দায়িত্ব দিতে চান সে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ যোগ্য হয়ে উঠবে। 

চার: বিবাহ দ্বারা সমাজ বিভিন্ন মরণব্যাধি থেকে রক্ষা পায়।

যিনা ভ্যাবিচার দ্বারা সমাজে যে ধংসাত্মক মরণব্যাধি, অশ্লীলতা ও অবৈধ যৌনাচারের  বিস্তার ঘটে, বিবাহের দ্বারা সেগুলো থেকে সমাজ নিরাপদ থাকে। তাছাড়া অবৈধ যৌন মিলনের কারণে সিফিলিস (treponema pallidum,) ঘনরিয়া (gonorrhoer) ক্যান্সারসহ বংশধারা নির্মূল করে দেওয়, শারীরিক অবস্থাকে দূর্বল করে দেওয়া এবং সন্তানদের সুস্বাস্থকে ক্ষীণ করে দেওয়ার মতো মারাত্মক মারত্মক রোগ সৃষ্টি হয় । এমনকি বিশ্বব্যাপী মহামারী ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা থাকে। 

পাঁচ: বিবাহ দ্বারা মানসিক বা আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়।

বিবাহের দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আধ্যাত্মিক হৃদ্যতা, ভালোবাসা ও দয়া বৃদ্ধি পায়। স্বামী দিন শেষে কাজ সেরে  বাড়ি ফিরে স্ত্রী- সন্তানদের দেখে সারা দিনের দুঃচিন্তা ভুলে যায়। এমনকি দিনভর পরিশ্রমের ক্লান্তি-অবসাধও মন থেকে বিলীন হয়ে যায়। অনুরূপভাবে স্ত্রীও যখন দিন শেষে স্বামীর সাথে একত্রিত হয় এবং সন্ধ্যায় তার প্রিয় জীবন সঙ্গীকে নিজের কাছে টেনে নেয় তখন তার মনও আনন্দ আর প্রফুল্লতায় ভরে যায়। এভবেই একে অপরের ছত্রছায়ায় আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে এবং দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এই কথাটি খুব চমৎকারভাবে ব্যক্তি করেছেন, অর্থ: তাঁর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে সেই সব লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা চিন্তা-ভাবনা করে। (সূরা রূম: ২১ নাম্বার আয়াত)


ছয়: বিবাহের দ্বারা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ থাকা যায়, কাম-প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাজত হয়। 

যেমন রাসূর (সা.) ইরশাদ করেছেন: হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ রাখে সে যেন অবশ্যই বিয়ে করে। কারণ এটা চোখকে অধিক সংযত করে এবং লজ্জাস্থানকে সবচেয়ে বেশি হেফাজত করে। আর যে বিবাহের সামর্থ রাখে না সে রোযাকে আবশ্যক করে নিবে। কারণ রোযা তার যৌন চাহিদাকে ধমনকারী। ( সহি মুসলিম ১০১৮)
 

সাত: বিবাহ ধনী হওয়া এবং রিযিক বৃদ্ধি হওয়ার মাধ্যম।

আল্লাহ তায়ালা বিবাহকে রিযিক বৃদ্ধির কারণ বানিয়েছেন, যাতে করে মানুষ এই ধারণ না করে যে, দাম্পত্য জীবন তার জন্য কষ্টকর হবে বা তার সাধ্যাতীত কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত (তারা পুরষ হোক বা মহিলা) তাদের বিবাহ সম্পাদন করো এবং তোমাদের গোলাম ও বাঁদীদের মধ্যে যারা বিবাহের উপযুক্ত, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। ( সূরা নূর:৩২)

আট: বিবাহ দ্বারা আত্মার সাধনা হয়।

অর্থাৎ পরিবারকে তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতা করা, তাদের হক্ব আদায় করা, তাদের চরিত্রের উপর ধৈর্যধারণ করা ও তাদের থেকে কষ্ট পেয়ে সহ্য করে নেয়া এবং তাদেরকে দ্বীনের পথে পথপ্রদর্শ করা, তাদের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ও সন্তান লালন-পালন করার দ্বারা আত্মার সাধনা হয়। তাছাড়া এগুলো অনেক ফজিলতপূর্ণ কাজ। স্ত্রী সন্তানদের জন্য কষ্ট সহ্য করা আল্লাহর রাস্তায় (নফল) জিহাদ করা থেকেও উত্তম। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন: যে টাকা তুমি খরচ কর আল্লাহর রাস্তায় এবং যা তুমি খরচ কর গোলাম আযাদ করার জন্য এবং যে টাকা মিসকিনদেরকে সদক্বাা কর এবং যে টাকা তুমি খরচ কর তোমার পরিবারের জন্য সেগুলোর মধ্যে সবচে বেশি ও বড় প্রতিদান পাবে সেই টাকার জন্য যা তুমি তোমার পরিবারের জন্য খরচ করেছ। (মুসলিম শরিফ ২/৬৯২) 
বিবাহের আরেকটি উপকারিতা হলো: বিবাহের দ্বারা পরিবার হয় এবং একে আপরের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: 
তিনি পানি দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাকে বংশগত ও বৈবাহিক আত্মীয়তা দান করেছেন। তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান। (সূরা: ফুরকান ৫৪)

নয়: বিবাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও জান্নাত লাভের মাধ্যম।

আল্লাহ তায়ালা নিজেই আমাদেরকে বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং যখন কোনো বান্দা আল্লাহর এই নির্দেশ পালনার্থে বিবাহ করল তখন সে আল্লাহর সন্তুষ্টজনক কাজই করল। আর আল্লাহ যখন কোনো বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো থেকে বঞ্চিত করেন না। কারণ তিনি এমন করুনাময় ও অসীম দয়ালু যার দয়া প্রতিটি জিনিসকেই বেষ্টন করে আছে। আর স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তান-সন্ততিরা যখন আল্লাহর আনুগত্যে জীবনযাপন করবে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর দয়ায় তাদেরকে জান্নাতে একত্র করে দিবেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: স্থায়ীভাবে অবস্থানের সেই উদ্যানসমূহ, যার ভেতর তারা নিজেরাও প্রবেশ করবে এবং তাদের বাপ-দাদাগণ, স্ত্রীগণ ও সন্তানদের মধ্যে যারা নেককার হবে, তারাও। আর তাদের অভ্যর্থনার জন্য ফেরেশতাগণ তাদের নিকট প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ( আর বলতে থাকবে) তোমরা (দুনিয়ায়) যে সবর অবলম্বন করেছিলে. তার বদৌলতে এখন তোমাদের প্রতি কেবল শান্তিই বর্ষিত হবে এবং তোমাদের প্রকৃত নিবাসে এটা কতই না উৎকৃষ্ট পরিণাম। 
(সূরা রা’দ ২৩-২৪) 
অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: (তাদেরকে বলা হবে) হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। (আমার সেই বান্দাগণ) যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান এনেছিলে এবং আনুগত ছিলে! তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ আনন্দোজ্জ্বল চেহেরায় জান্নাতে প্রবেশ করো। সোনার পেয়ালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদের সামনে ঘোরাঘুরি করা হবে এবং জান্নাতে তাদের জন্য এমন সবকিছুই থাকবে, যার চাহিদা মনে জাগ্রত হবে এবং যা দ্বারা চোখ প্রীতি লাভ করবে। আর এই জান্নাতে তোমরা সর্বদা থাকবে। (সুরা যুখরুফ৬৮-৭১)

দশ: বিবাহের দ্বারা অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ হয়। 

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি বিবাহ করল সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করল। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে যেন সে আল্লাহকে ভয় করে। (মেশকাত:২/২৬৮) 
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন: এই হাদিসের অর্থ হল: বিবাহ যিনা থেকে বিরত রাখে। আর যিনি থেকে বিরত থাকাটা ঐদুইটি জিনিস থেকে একটি, যে দুইটি জিনিস হেফাজত করলে রাসূল (সা.) ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই উরুর মাঝখানের বস্তুর (লজ্জাস্থান) জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জিম্মাদার। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৪)

তা ছাড়াও বিবাহরে বহু ফায়াদা বা উপকারিতা রয়েছে। যেমন: পুরুষ নিজের এবং একজন মুসলিম বোনের সতীত্ব রক্ষা করা, স্ত্রীর জন্য খরচ করা ও তার হক্ব আদায় করা, সন্তান লালন-পালন করা এবং তাদের উপর ধৈর্যধারণ করার সাওয়াবও স্বামী পাবে। এ সকল কাজে যত নিয়ত করবে ততই সাওয়াব পাবে। অনুরূপভাবে বিবাহ হলো আত্মার প্রশান্তি এবং মন থেকে খারাপ চিন্তা দূরকরণের ও মনকে প্রফুল্ল করার বড় মাধ্যম। 



Post a Comment

0 Comments